
বিভিন্ন সময় পত্রিকা এবং সংবাদ মাধ্যমে চলন্ত বাস অথবা ট্রেনে নারী নির্যাতন এবং ধর্ষণ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ থেকে সংশ্লিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারি। প্রত্যেকটি ঘটনা নিয়ে কয়েকদিন লেখালেখি হয় এরপর নতুন ঘটনার কাছে পুরাতন ঘটনা চাপা পড়ে যায়। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাতে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী ইউনিক রোড রয়েলসের ‘আমরি ট্রাভেলসের’ একটি বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
চলন্ত বাসে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ডাকাতি শেষে একই জায়গায় বাসটি ঘুরিয়ে নিয়ে গিয়ে ভোর ৪টার দিকে ডাকাতরা নেমে যায়। এ সময় ডাকাতি ছাড়াও নারী যাত্রীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলেন যাত্রীরা। ডাকাতির সময় দুই নারী যাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা চলছে। টাঙ্গাইলের এসপি মো. মিজানুর রহমান সংবাদ মাধ্যমে বলেন, “ডাকাতির ঘটনায় মামলা হওয়ার ১৪ ঘণ্টার মধ্যেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”
যৌন নিপীড়নের’ মামলায় গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে দুই যুবক আদালতে ‘স্বীকারোক্তিমূলক’ জবানবন্দি দিয়েছেন। বিডিনিউজ এর সংবাদ অনুসারে ডিবির এসআই আহসানুজ্জামান বলেন, ‘স্বীকারোক্তিতে ওই দুই যুবক আদালতকে বলেছেন, মুহিত ও তারা দুজন ছাড়াও ডাকাতি ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় শ্যালক-দুলাভাইসহ আরো চারজন ছিলেন।’ গুড় ব্যবসায়ী ৭৩ বছর বয়সী মজনু আকন্দও সেদিন ওই বাসে ছিলেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘ওই রাতে আমরা যে চিল্লাচিল্লি শুনছি... তাতে মা-বোনের ইজ্জতের... গাড়ির ভেতরে আমাদের কোনো ভাষা ছিল না। ওনাদের মানসম্মানের ক্ষতি করছে, ধস্তাধস্তি করছে। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দুজন নারী। একজনের বয়স ছিল আনুমানিক ২০ বছর, আরেকজনের ২৫-৩০ বছর।’
বিবিসির প্রতিবেদনে দেখলাম সোহাগ হাসান নামে এক যাত্রী বলেন, ‘আরেকজন মহিলা, ২৫-৩০ বছর বয়স হবে। ওনার সবকিছুই নিয়ে নিছে। উনি আমাদের দুই সিট সামনে ছিল। আমাদের তাকাইতে দিচ্ছিল না। ওনার গায়ের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিচ্ছিল। আমরা যখন বারবার প্রতিবাদ করতে যাচ্ছি, তখন আমাদের মারতে চেষ্টা করে... পেছনে শুধু হিন্দু মেয়েটাকেই নিয়ে যায়। আর ওনার সাথে সিটের ওখানে বসেই জোরজবরদস্তি করে।’ গাড়িটি প্রায় তিন ঘণ্টা ডাকাতদের দখলে ছিল এবং এই সময়ের মাঝে ডাকাতরা বাসটিকে বারবার ঘুরাতে থাকে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি শনিবার জেলা পুলিশ সুপারের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কয়েকজন যাত্রীর কাছে বিষয়গুলো শুনেছি। সেখানে প্রাথমিকভাবে যে বিষয়টি এসেছে, এখানে কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। এখানে নারীদের কাছ থেকে কিছু স্বর্ণ ও রুপা লুণ্ঠিত হয়েছে। এই লুণ্ঠন করার সময় ডাকাতরা নাকফুল ও নাকের দুল যখন নিচ্ছিল, তখন হয়তো তাদের সঙ্গে (নারী) টাচে গিয়েছে। ‘ডাকাতির ঘটনায় চালক, সুপারভাইজার ও হেলপার বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দীর্ঘ সময় গাড়িতে ডাকাতরা কি কি করেছিল তার জন্য বিভিন্নভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছি।
অনেকদিন থেকেই চলন্ত গাড়িতে অথবা লঞ্চে মেয়েরা ধর্ষিতা হচ্ছেন। পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত দুয়েকটা ঘটনার পুনরায় স্মরণ করছি। গত ২০২৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক এলাকায় একটি চলন্ত বাসে এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। বাসটির ড্রাইভার-হেলপার মিলে নারীকে ধর্ষণ করার অপরাধে থানায় মামলা হলে ঘটনায় জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল সিএমপির কর্ণফুলী থানা পুলিশ। এই নারী যাত্রী রাত সাড়ে ৯টার সময় পটিয়ার মনসা বাদামতল এলাকা থেকে মিনিবাসে ওঠে চট্টগ্রাম শহরের বাসায় আসার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
বাসের অন্যান্য যাত্রীরা মইজ্জ্যারটেক মোড়ে নেমে গেলে ভিকটিম নারী বাসে একা হয়ে যান। পরে বাসটি শাহ আমানত সেতুর টোলপ্লাজা পার হতেই তাকে একা পেয়ে হেলপার মিজান চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণ করেন। পরে বাসটি নতুনব্রিজের চত্বর ঘুরে আবারও সেতু পার হয়ে পটিয়ার দিকে রওনা হলে ড্রাইভারও নারীকে ধর্ষণ করেন। পরে বাসটি বিভিন্ন জায়গা ঘুরে পটিয়া শান্তিরহাট বাজারে এসে ভিকটিমকে ফেলে পালিয়ে যান। গত ২০২২ সালে কুষ্টিয়া থেকে ছেড়ে আসা চলন্ত বাসে ডাকাতির পর ধর্ষণের শিকার এক নারী যাত্রীর জবানবন্দি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল।
তিনি বলেছিলেন, ‘রাত সাড়ে ১১টায় তাদের বাস সিরাজগঞ্জের একটি হোটেলে পৌঁছায়। খাওয়া শেষ করে রওনা হওয়ার পাঁচ মিনিট পরই রাস্তা থেকে ২০-২২ বছর বয়সের ৩ জন বাসে ওঠেন। তারা জানান, সামনে তাদের আরও লোক আছেন। কিছু দূর যাওয়ার পর আরও চারজন ওঠেন। তাদের মধ্য থেকে একজন বলেন, ‘আমার লোক আছে আরও।’ কিছু দূর যাওয়ার পর আরও ছয়জন ওঠেন। এভাবে মোট ১৩ জন বাসে ওঠেন। তারা বাসের পেছনে বসেন। একজন তার (ভুক্তভোগী নারী) পাশে বসতে চান। কিন্তু সুপারভাইজার তাকে উঠিয়ে দেন। পরে কাছের একটি সিটে বসে সিগারেট খেয়ে ধোঁয়া ছাড়েন। নিষেধ করলে তারা তাকে গালাগাল করেন। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর তাদের মধ্যে তিনজন চালকের পাশে বনেটে গিয়ে বসেন। তারা সামনে নামার কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, একপর্যায়ে চালককে উঠিয়ে তাদের মধ্য থেকে একজন গাড়ি চালানো শুরু করেন। তারা বাসের চালক ও সুপারভাইজারকে পেছনে নিয়ে আসেন। এরপর প্রথমে পুরুষ যাত্রীদের হাত, মুখ, চোখ বাঁধেন। পরে মেয়েদের বেঁধে ফেলেন। মুঠোফোন, গয়না, টাকা, সব লুট করে নেন। এ সময় অনেককে মারধর করেন। একপর্যায়ে ডাকাত দলের ছয়জন তাকে ধর্ষণ করেন। ধর্ষণকালে তার হাত ও চোখের বাঁধন খুলে যায়।
পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ বা গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আর ঘটনা কেবল ধর্ষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষিতাকে হত্যা করা হচ্ছে নির্মমভাবে অথবা ধর্ষিতা পরিবার, সমাজ ও লোকলজ্জার ভয়ে আত্মহত্যা করছে। প্রতিদিন সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও আইনবিরুদ্ধ তৎপরতা বেড়েছে, তা জননিরাপত্তার নাজুক অবস্থারই সাক্ষ্য বহন করে। যত দ্রুত সম্ভব এ পরিস্থিতির পরিবর্তন আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও সক্রিয়তা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং মহিলা পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ৪০১ জন, ২০১৪ সালে ৬৬৬, ২০১৫ সালে প্রায় ৭০০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। মহিলা পরিষদের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে দেশে ১০৫০ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যে দেখা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৪ হাজার ৭৮৭টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৬২৭ জন। তবে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা নেমে এসেছে ৩২৯-এ।
দিনের বেলায় অনেকে জেলা শহরে চাকরি বা ব্যবসা করেন আর ওনাদেরকে রাতের গাড়ি করেই বাড়িতে যেতে হয়। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সারাদিন অনেক কষ্ট করে ফেরি করে জিনিসপত্র বিক্রয় করেন এবং রাতে টাকা নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। আর সেই কষ্টার্জিত টাকা যদি ডাকাতদের হাতে তুলে দিতে হয় তার চাইতে দুঃখজনক আর কি হতে পারে। ছেলেদের পাশাপাশি অনেক মেয়েরা চাকরি করে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে কাজ করে যাচ্ছেন। এক জেলার মেয়ে চাকরি এবং লেখাপড়ার জন্য দূরের ভিন্ন জেলায় কর্মরত থাকেন। গাড়িতে যাওয়া-আসা করার সময় অনেক মেয়েরা ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছেন।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা হচ্ছে ধর্ষণের ঘটনা। লোকলজ্জার ভয়ে অথবা আইনি সহায়তা প্রাপ্তির বিলম্ব জনিত কারণে অনেক ধর্ষিতা এবং তার পরিবার ধর্ষণের ব্যাপারে কিছু বলতে চান না। কিছু কিছু ঘটনা যদি বিশ্লেষণ করেন তাহলে দেখবেন সমাজের বিশাল একটা ধর্ষকের পক্ষে কথা বলেন এবং ধর্ষিতার নামে কুৎসা রটনা করেন। চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণের ঘটনার বিস্তারটা একটু ভয়াবহ রকমেরই হয়ে উঠছে দিন দিন। মনে হচ্ছে যৌন অপরাধীদের জন্য এটা একটা ট্র্যাডিশনে পরিণত হয়েছে। তবে কয়েকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে কিছু নরপিশাচের শাস্তি হলেও থেমে নেই ধর্ষণের ঘটনা, ঘটেই চলেছে। এ ব্যাপারে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করাও বিশেষ প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
Comments