Image description

জুলাই ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। টানা ১৬ বছর ধরে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসন, ভোটাধিকার হরণ, বিরোধী দমন, গুম-খুন ও প্রশাসনিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনগণের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ সেই মাসে বিস্ফোরিত হয় গণঅভ্যুত্থানে। ছাত্রসমাজকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও খুব দ্রুত এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। এটি কোনো পরিকল্পিত সহিংসতা ছিল না; বরং ছিল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক গণজাগরণ।

তবে সেই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ভাঙন, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং পরাজিত ফ্যাসিবাদী শক্তির সক্রিয় ষড়যন্ত্রের সুযোগে সংঘটিত হয় ভয়াবহ নাশকতা। দেশের বিভিন্ন থানা ও নিরাপত্তা স্থাপনা থেকে লুট হয় বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ। চার মাস পেরিয়ে গেলেও এর একটি বড় অংশ আজও উদ্ধার হয়নি। সামনে জাতীয় নির্বাচন- এ অবস্থায় নিখোঁজ অস্ত্র ঘিরে উদ্বেগ ক্রমেই গভীর হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের নথি অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫২ হাজারের বেশি গোলাবারুদ লুট হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে এর বড় একটি অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ১ হাজার ৩৪০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ২৮০টি গুলির কোনো হদিস নেই। এই অস্ত্রগুলো কার হাতে রয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হতে পারে তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্পষ্ট কোনো জবাব পাওয়া যাচ্ছে না।

জুলাইয়ের ৪, ৫ ও ৬ তারিখে দেশের অন্তত ১২০টি থানায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ৫৮টি থানা পুরোপুরি পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং ৬২টি থানায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১১৪টি পুলিশ ফাঁড়ি এবং এক হাজারের বেশি যানবাহন। বহু থানায় মালখানা, অস্ত্রাগার ও  নথিপত্র সংরক্ষণের কক্ষ পুড়ে যাওয়ায় ঠিক কত অস্ত্র ও গোলাবারুদ সেখানে মজুত ছিলÑতা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অস্ত্র উদ্ধারের সরকারি হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। মাত্র দুই দিনে ডিএমপির ২১টি থানায় হামলা এবং ১৩টি থানায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, বাড্ডা, শ্যামপুর, খিলগাঁও, আদাবর, পল্টন, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, ওয়ারী ও খিলক্ষেত থানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব এলাকায় থানাগুলোর কার্যত অচল হয়ে পড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

ঢাকার বাইরেও পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলার ঘটনায় ১৩ জন পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন এবং আহত অবস্থায় হাসপাতালে আরও একজনের মৃত্যু হয়। নোয়াখালীর চাটখিল ও সোনাইমুড়ী থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিন পুলিশ সদস্যসহ আটজন নিহত হন। একই সময়ে ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, বগুড়া, ফেনী, কুষ্টিয়া, লক্ষ্মীপুর ও ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন থানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব থানার অস্ত্রাগার থেকেই অন্য মালামালের সঙ্গে লুট হয় আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই নাশকতা ছিল গণঅভ্যুত্থানের মূল স্রোতের বাইরে সংঘটিত বিচ্ছিন্ন ও সুযোগসন্ধানী কর্মকাণ্ড। আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ারের মধ্যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে পড়ায় অপরাধী চক্র ও ফ্যাসিবাদী শক্তির দোসররা অস্ত্র লুটের সুযোগ পায়। এটি আন্দোলনের চরিত্র নয়, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক ব্যবহারের ফল।

অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও র‌্যাব যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৮১ শতাংশ এবং গোলাবারুদের ৭৩ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭৭ শতাংশ আগ্নেয়াস্ত্র ইতোমধ্যে উদ্ধার হয়েছে। তবে এখনো যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বাইরে রয়েছে, তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি। 

পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া ও জনসংযোগ বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন বলেন, নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া শতভাগ অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব নয়। তিনি জানান, অস্ত্র উদ্ধারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুরস্কার ঘোষণাও করেছিল, কিন্তু প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি।

এই পরিস্থিতিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তি এবং গত ১৬ বছরে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থেকে সুবিধাভোগ করা একটি আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠী এখনো প্রশাসনের ভেতরে সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নির্বাচন সামনে রেখে প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়িয়ে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করতে পারে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সরাসরি দমননীতি নয়, বরং নীরব কৌশলে মাঠ প্রশাসনকে দুর্বল করা, নির্বাচনকালীন কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তোলাই হতে পারে এই গোষ্ঠীর কৌশল। নিখোঁজ অস্ত্র এই প্রক্রিয়ায় ব্যবহƒত হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল জনগণের ন্যায্য ও স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। কিন্তু সেই সময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ভাঙনকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করেছে। 

তার মতে, এসব অস্ত্রের বড় অংশ এখন পেশাদার সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং সীমান্ত দিয়েও অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন বা রাজনৈতিক সংঘাতে এসব অস্ত্র ব্যবহƒত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।