Image description

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানিতে নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু করেছে মিয়ানমার। দেশটির পক্ষ থেকে গাম্বিয়ার আনা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে বলা হয়েছে, এসব অভিযোগ ‘প্রমাণহীন’ এবং ভিত্তিহীন।

মিয়ানমারের দাবি
শুনানিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং বিচারকদের বলেন, গাম্বিয়া তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ দিতে পারেনি। তিনি দাবি করেন, রাখাইনে সেনাবাহিনী কোনো গণহত্যা চালায়নি, বরং তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছিল।

হ্লাইং আদালতকে বলেন, “উত্তর রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাসীদের অবাধ বিচরণ করার সুযোগ দিয়ে মিয়ানমার অলস বসে থাকতে পারে না। ক্লিয়ারেন্স অপারেশন বা ‘শুদ্ধি অভিযান’ ছিল কেবল একটি সামরিক পরিভাষা, যা মূলত বিদ্রোহ দমন বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানকে বোঝায়।”

গাম্বিয়ার অবস্থান
এর আগে গত সোমবার গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাউদা জালো আদালতকে বলেছিলেন, মিয়ানমার পরিকল্পিত ‘গণহত্যামূলক নীতি’র মাধ্যমে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। গাম্বিয়ার পক্ষের আইনজীবী ফিলিপ স্যান্ডস যুক্তি দেন যে, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা এবং একের পর এক গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়াকে কোনোভাবেই ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াই’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায় না। ৫৭টি মুসলিম দেশের সংগঠন ওআইসির সমর্থনে গাম্বিয়া ২০১৯ সালে এই মামলাটি দায়ের করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর অভিযানে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয় এবং প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে কক্সবাজারের জনাকীর্ণ ক্যাম্পগুলোতে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মানবেতর জীবন যাপন করছে। ২০১৮ সালে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করার সুপারিশ করা হয়। তবে ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা জান্তা সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গ
মিয়ানমারের প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং দাবি করেন, তারা বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, “২০১৭ সাল থেকে আমাদের নেওয়া নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাগুলো গাম্বিয়ার দাবির বিপরীত। তবে কোভিড-১৯ মহামারিসহ বিভিন্ন বাহ্যিক কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, গণহত্যার রায় মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক সম্মানে একটি ‘স্থায়ী কলঙ্ক’ হিসেবে চিহ্নিত হবে।

ভবিষ্যৎ রায় ও প্রভাব
রয়টার্সের তথ্যমতে, এই ঐতিহাসিক মামলার চূড়ান্ত রায় হতে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সময় লাগতে পারে। আইসিজে তিন দিন ধরে সাক্ষী এবং বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গাদের জবানবন্দি শুনবে, তবে সেই অধিবেশনগুলো সংবাদমাধ্যম ও জনসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মামলার রায় গাজার যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলাসহ অন্যান্য গণহত্যা মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ অনুযায়ী, কোনো জাতীয়, জাতিগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই যখন অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন তাকে গণহত্যা বলা হয়।