পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর দেশের দীর্ঘদিনের জোটের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, কৌশলগত স্বার্থে ওয়াশিংটন ইসলামাবাদকে ব্যবহার করেছে, তারপর ‘টয়লেট পেপারের মতো’ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।
মঙ্গলবার পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে দেওয়া এক বক্তব্যে আসিফ বলেন, ১৯৯৯ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের নতুন করে ঘনিষ্ঠ হওয়া ছিল একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল।’ তাঁর ভাষায়, আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়ায় পাকিস্তান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই দেশে রাজনীতি ও ধর্মীয় মানসিকতায় একেবারে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পর্যায়েও পরিবর্তন আনা হয়েছিল। কারণ, আমাদের একটি ‘মেইড ইন আমেরিকা জিহাদ’ লড়তে হয়েছিল। আমরা সেই অভিজ্ঞতা থেকে কিছুই শিখিনি। পরে তারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর যে সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, তারাও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের জন্য মরিয়া ছিল। হিলারি ক্লিনটন জাতিসংঘে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে বলেছিলেন, কীভাবে তারা আমাদের টিস্যু পেপারের মতো আরও খারাপভাবে বললে, বরং টয়লেট পেপারের মতো ফেলে গেছে। তবু আমরা শিখিনি। ২০০০ সালে বিল ক্লিনটন যখন মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য এখানে এসেছিলেন, তখনকার ক্ষমতাসীনরা অতিরিক্ত বশ্যতা দেখাতে শুরু করেন। এরপর তারা (আমেরিকা) আবারও আমাদের পরিত্যাগ করে। কিন্তু তাতেও আমরা শিক্ষা নিইনি।’
আসিফ আরও বলেন, ‘পাকিস্তানকে টয়লেট পেপারের চেয়েও খারাপভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। প্রয়োজন শেষ হলে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে।’
তিনি পাকিস্তানের ওই যুদ্ধে সম্পৃক্ততাকে ‘ব্যয়বহুল জুয়া’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা ও উগ্রবাদের বীজ বপন করেছে, যার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে।
আসিফ ১৯৮০ এর দশকে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ নিয়ে প্রচলিত ধারণাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান কোনো ধর্ম রক্ষার তাগিদ থেকে ওই যুদ্ধে যায়নি, বরং সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের অংশ। এতে ‘দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা ও উগ্রবাদ’ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তানে প্রবেশ করে, তারা কাবুল সরকারের আমন্ত্রণেই এসেছিল, সেটা কোনো আগ্রাসন ছিল না। যে তত্ত্ব ওটাকে আগ্রাসন বলে, সেটা আমেরিকার দেওয়া তত্ত্ব। আমরা ইসলাম বা ধর্মের প্রতি ভালোবাসা থেকে সেই যুদ্ধে অংশ নিইনি। তখনকার দুই শাসকই কেবল নিজেদের শাসনের বৈধতা আর পরাশক্তির সমর্থন চেয়েছিলেন। বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া উচিত এটা কোনো ‘জিহাদ’ ছিল না, এটা ছিল পরাশক্তিগুলোর যুদ্ধ।
খাজা আসিফ অভিযোগ করেন, যুদ্ধের যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘সেই যুদ্ধের জন্য আমরা আমাদের পাঠ্যক্রম বদলে ফেলেছিলাম। আজও আমরা ১৯৬০ ও ৭০ এর দশকে পড়া পাঠ্যক্রমে পুরোপুরি ফিরতে পারিনি।’
৯/১১–এর পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়েও আসিফ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সামরিক শাসক জিয়াউল হক ও পারভেজ মোশাররফ পাকিস্তানকে এই সংঘাতে টেনে এনেছিলেন। এতে দেশটি তালেবানের বিরোধী অবস্থানে যায়। এর আগে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে পাকিস্তান মুজাহিদিনদের সমর্থন দিয়েছিল, যাদের একটি অংশ পরবর্তীতে তালেবানে রূপ নেয়।
১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা নেওয়া মোশাররফ ৯/১১–এর পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হন। ২০০১ সালে তিনি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা, লজিস্টিক সহায়তা, সামরিক স্থাপনা, গোয়েন্দা সহযোগিতা ও জনবল সরবরাহ করে।
২০০২ সালের পর থেকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা পেয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে দেশের ভেতরে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সমালোচনা বাড়ে। একই সঙ্গে তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)–র মতো বিদ্রোহী সংগঠনের উত্থান ঘটে।
আসিফ বলেন, ‘এই ক্ষতিগুলো কখনো পূরণ করা সম্ভব নয়। এগুলো ছিল অপূরণীয় ক্ষতি, যা পাকিস্তানকে আদতে অন্যদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের দাবার বোর্ডে পরিণত করেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির ভেতরে বিতর্কিত। সমালোচকদের মতে, এতে জাতীয় স্থিতিশীলতার চেয়ে বিদেশি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে উগ্রবাদ ও অর্থনৈতিক চাপ বেড়েছে। আসিফের বক্তব্যের পর আফগানিস্তানে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও তালেবান আলোচনায় বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি লেখেন, ‘এটি সবারই জানা যে, আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সহযোগিতার জন্য পাকিস্তান সামরিক ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। একই সঙ্গে এটিও জানা যে, পাকিস্তানেরই রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিয়েছিল।’
বক্তব্যে আসিফ ইতিহাসবিদ কে. কে. আজিজের বই ‘দ্য মার্ডার অব হিস্ট্রি’র কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেদের জাতীয় নায়ক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা আমাদের ওপর আগ্রাসন চালানো ব্যক্তিদেরই আমাদের নায়ক বানিয়েছি। এমনকি আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নামও তাদের নামে রেখেছি।’
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা স্বাধীনতাসংগ্রামীদের ভুলে যাওয়ার বিষয়েও তিনি আক্ষেপ করেন। আসিফ বলেন, ‘যাঁরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছেন এবং জীবন দিয়েছেন, আমরা তাঁদের স্মরণ করি না। আজ আমাদের অর্ধেকের বেশি মানুষ নিজেদের শিকড় খুঁজতে পশ্চিমের দিকে তাকায়। কিন্তু আমরা এই মাটির মানুষ।’




Comments