Image description

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের ১১টি আবাসিক হলে ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত’ ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি প্রকাশ করা হয়েছে।

সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ হিল গালিবের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে এই কমিটিগুলো প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত এসব কমিটির তালিকায় প্রত্যেকটি হলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম প্রকাশ করা হয়।

ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া:
কমিটি ঘোষণার ঘটনাকে 'হাস্যকর' ও 'ষড়যন্ত্র' হিসেবে দেখছে অন্যান্য ছাত্রসংগঠনগুলো।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “এই সংগঠনটি নিষিদ্ধ এবং তাদের নেতৃত্ব পলাতক। তারা শিক্ষার্থীদের থেকেও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এমতাবস্থায় কমিটি ঘোষণা নিছকই হাস্যকর ও বাস্তবতাবিবর্জিত। আমরা তাদের এই কমিটি ঘোষণাকে কোনো গুরুত্ব দিচ্ছি না।”

ছাত্রলীগের কমিটি প্রকাশ ক্যাম্পাসকে ‘অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল। তিনি বলেন, “নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী একটি সংগঠনের হল কমিটি গঠন সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ছাড়া যাদের দিয়ে কমিটি দেওয়া হয়েছে তারা সবাই ক্যাম্পাসে চিহ্নিত অপরাধী। তারা জুলাই-অগাস্টে ছাত্র-জনতার উপর সন্ত্রাসী হামলাসহ চব্বিশ পূর্ববর্তী সময়ে সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, শিক্ষক লাঞ্ছনাসহ ছাত্র নির্যাতনের মত নানা ফৌজদারি অপরাধে জড়িত।”

তিনি বলেন, “এটি নিশ্চিতভাবেই ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র। ছাত্রলীগের অনেকেই এখনও ক্যম্পাসে বিচরণ করছে। মাদক বাণিজ্যসহ নানা রকম অপকর্মও করছে এই গ্রুপটি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের উচিত ছাত্রলীগের এসব সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।”

বাম সংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোট’ এর মুখপাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “জুলাই আন্দোলনে সহস্রাধিক শহীদের রক্ত হাতে নিয়ে ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের এদেশে রাজনীতি করার প্রাসঙ্গিকতা আছে বলে আমি মনে করি না। জুলাইয়ে ঘটা গণহত্যার বিচার এখনও হয়নি। নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের কমিটি প্রকাশ একপ্রকার দুঃসাহসই বলা যায়। তবে বাংলাদেশের মানুষ জুলাইকে এখনও ভুলে যায়নি, তাই তাদের এসব কর্মকাণ্ড এদেশের মানুষ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।”

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অবস্থান:
‘নিষিদ্ধ’ কোনো সংগঠন ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “অনলাইন বা ফেইসবুকে অনেকে অনেক কিছু করতে পারে। তবে প্রকাশ্যে তাদের কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার সুযোগ নেই। তাদের অনলাইনকেন্দ্রিক বিষয়গুলোও আমরা গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে জানাব। যথাযথ বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা কোনো কিছু করতে পারবে না।”

এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ করা হলে সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ-হিল-গালিব বলেন, যাদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে তারা সবাই নির্যাতনের শিকার। সংগঠনকে সক্রিয় ও সংগঠিত করতেই তাদের নেতৃত্বে আনা হয়েছে। 

রাবি ক্যাম্পাসে মোট ছেলেদের ১১টি এবং মেয়েদের ছয়টি হল থাকলেও ঘোষিত কমিটি শুধু ছেলেদের হলগুলো নিয়েই করা হয়েছে। এর মধ্যে গণঅভ্যুত্থানের পর নাম পরিবর্তন হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল থেকে বিজয়-২৪ হলে রূপান্তরিত হলেও ঘোষণায় পুরোনো নাম ‘বঙ্গবন্ধু হল’ ব্যবহার করা হয়েছে। ওই হলে তানভির আহমেদকে সভাপতি এবং তামিম হাসানকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাখা হয়েছে।

অন্যান্য হলগুলোর মধ্যে শের-ই বাংলা ফজলুল হক হলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যথাক্রমে শুভ্র দেব সাহা ও মোবাশ্বির রায়হান রাফির নাম রয়েছে। শাহমখদুম হলে এলাহি শেখ ও এহসান আহমেদ আকাশ, নবাব আব্দুল লতিফ হলে মাসুদুর রহমান ও আব্দুল জলিল চৌধুরী, সৈয়দ আমির আলী হলে গোলাম কিবরিয়া ও মশিউর রহমান মিহাদ, শহীদ হবিবুর রহমান হলে রাইসুল ইসলাম আকাশ ও সোহান হাসান, মতিহার হলে ডালিম মির্জা ও আব্দুল্লাহ শোয়াইব, মাদার বখ্স হলে শামীম সিকদার ও ফজলে রাব্বী, জিয়া হলে মাজেদুল ইসলাম মৃদুল ও তানজিল হাসান সুমন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে কামরুল হাসান ও মোস্তাফিজুর রহমান তুষার এবং শহীদ শামসুজ্জোহা হলে রাহাত হাসান খান রাহাত ও আব্দুল্লাহ আল আজমীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘোষিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যাদের নাম এসেছে তাদের কেউই বর্তমানে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছেন না। তারা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং তাদের অনেকেই বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন। পাশাপাশি কারও কারও বিরুদ্ধে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাভোগের ঘটনাও রয়েছে। বর্তমানে তারা প্রকাশ্যে না থাকায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।