আগস্ট-পরবর্তী ৩ মাসে ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার ৩০০০ শিক্ষক; প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন
২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী তিন মাসে ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তিন হাজারের বেশি শিক্ষক। যারা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এসব নির্যাতনে অন্তত ছয়জন শিক্ষকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া পাঁচ শতাধিক শিক্ষক আহত ও গুরুতর অসুস্থ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। লাঞ্ছনা ও অপমানে অনেক শিক্ষক হার্ট অ্যাটাক বা ব্রেন স্ট্রোক করে হাসপাতালের বিছানায় লড়ছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাদের জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বহিরাগত যুবক ও সুযোগ সন্ধানী স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয় এই মব শাসনে।
হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া শাহজাহানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রেজাউল করিম, যিনি ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হওয়াদের একজন। ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হন। ১০-১৫ জন বহিরাগত যুবক তাকে অবরুদ্ধ করে মিথ্যা অভিযোগে পদত্যাগের জন্য চাপ দেয়। এই পুরো ঘটনাটি ফয়সাল মিয়া নামের এক যুবক ফেসবুক লাইভে প্রচার করে আনন্দ উদযাপন করছিল। চাপের মুখে মানসিক স্থিরতা হারিয়ে চেয়ারেই অচেতন হয়ে পড়েন প্রধান শিক্ষক।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ভয়ের কারণে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে এই ঘটনাটি মামলার বদলে সমঝোতার মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
শিক্ষক আবুল কাসেম জানান, চাপ সইতে না পেরে প্রধান শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি মানসিকভাবে এতটাই ভেঙে পড়েন যে এখনো সুস্থ হতে পারেননি। ঘটনার পর পর মাধবপুর থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছিল।
অন্যদিকে ওই এলাকার মোড়লদের হাত করে ফয়সালের অভিভাবকরা ঘটনাটির মীমাংসার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির শুরু করেন বলে জানা গেছে।
এক পর্যায়ে ম্যানেজিং কমিটি, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আয়োজনে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দেওয়া হয়।
একই চিত্র দেখা গেছে কিশোরগঞ্জের আরজত আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ে। সহকারী প্রধান শিক্ষক ও কিছু স্বার্থান্বেষী শিক্ষকের উসকানিতে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে প্রধান শিক্ষক আবুবকর সিদ্দিককে লাঞ্ছিত করা হয়। হামলার ভয়ে তিনি সপরিবারে আত্মগোপনে যান এবং সেখানে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।
যদিও পরবর্তী তদন্তে তার বিরুদ্ধে আনা ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে এবং তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি এখনো বিধ্বস্ত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ঘটনায় প্রকাশ্যে ইন্ধন দিয়েছিলেন সহকারী প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবীর বাচ্চু, খণ্ডকালীন শিক্ষক জুনায়েদ হোসেন জুয়েল এবং স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র মেহাদি হাসান শুভ। নেপথ্যে ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক। তিনি জামায়াতের সমর্থক। এ ছাড়া বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সাবেক সদস্য এহসানুল ইসলাম দিপুসহ আরো কয়েকজন শিক্ষক সুযোগ বুঝে ছাত্রদের উসকে দেন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, সেদিন শিক্ষার্থীদের ক্লাস থেকে বের করে আন্দোলনে নামানো হয় এবং বাইরে থেকে আসা কিছু ব্যক্তি ভয়ভীতি দেখিয়ে মিছিলে যুক্ত করে। পরে প্রধান শিক্ষকের বাসায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে তিনি পরিবারসহ আত্মগোপনে যান এবং সেখানে স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যেখানে প্রায় দুই সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন।
প্রধান শিক্ষক আবুবকর সিদ্দিক বলেন, বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশের কথা বিবেচনায় তিনি আইনি পদক্ষেপ নেননি। তার দাবি, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির নির্বাচন, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট মিলিয়েই এই মব তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি আংশিক সুস্থ হলেও চিকিৎসকের পরামর্শে সীমিত দায়িত্ব পালন করছেন।
শরীয়তপুরের কোদালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেন মৃধাকেও একই কায়দায় পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একটি পক্ষ তাকে কোণঠাসা করে ফেলে, যার ফলে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। বর্তমানে তিনি কর্মস্থলে ফিরলেও সেদিনের ট্রমা তাকে আজও তাড়িয়ে বেড়ায়।
প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেন বর্তমানে চাকরিতে রয়েছেন। একাধিকবার জানতে চাইলেও তিনি সে বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি। তবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গেছে। এ বিষয়ে এখন আমি আর কোনো কথা বলতে চাই না।’
এই শিক্ষকের পরিবারের কয়েকজন সদস্য জানান, সে সময় পদত্যাগে বাধ্য করায় তিনি চাপের মুখে স্ট্রোক করেন।
শিক্ষক সমাজ মনে করছেন, তুচ্ছ কারণে বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার জেরে শিক্ষকদের ওপর এমন আক্রমণ শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চাওয়া ব্যক্তিদের কারণে শিক্ষকরা আজ সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
অনেক ঘটনায় মামলা হলেও স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালীরা দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি শিক্ষকদের আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, মব শাসনের মাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের এমন লাঞ্ছিত করা দেশের সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র।




Comments