জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বাংলাদেশ এখন কেবল পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে নয়, বরং এক নজিরবিহীন স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে থমকে দাঁড়িয়েছে। ‘দ্য ল্যানসেট কাউন্টডাউন অন হেলথ অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর সদ্য প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক হাড়হিম করা চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল ২০২৪ সালেই অত্যধিক তাপপ্রবাহের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে বাংলাদেশের সম্ভাব্য আয় ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা)। এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ল্যানসেট কাউন্টডাউন গ্লোবাল টিম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সি৩ ইআর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ ইউনিট আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদনের তথ্য উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশের কয়েক দশকের উন্নয়ন অর্জন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
তপ্ত হচ্ছে আকাশ, কমছে কর্মঘণ্টা
প্রতিবেদনের মূল প্রবন্ধে পরিবেশ অর্থনীতিবিদ ড. সৌর দাশগুপ্ত দেখান, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বহুগুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালে তাপজনিত কারণে বাংলাদেশে ২৯ বিলিয়ন সম্ভাব্য কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা নব্বই দশকের তুলনায় ৯২ শতাংশ বেশি। এই ক্ষতির সবচেয়ে বড় শিকার দেশের কৃষি খাত। মোট হারানো কর্মঘণ্টার ৬৪ শতাংশই ছিল কৃষিশ্রমিকদের, যা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে দেশের প্রতিটি মানুষ গড়ে ২৮.৮ দিন অতিরিক্ত ও অসহনীয় গরমের মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩.২ দিন ছিল সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল।
বায়ুদূষণে বছরে সোয়া দুই লাখ মৃত্যু
ল্যানসেটের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যঝুঁকির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০২২ সালে কেবল সূক্ষ্ম বস্তুকণার (পিএম ২.৫) সংস্পর্শে এসে বাংলাদেশে ২ লাখ ২৫ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। এটি ২০১০ সালের তুলনায় ৩৮ শতাংশ বেশি। এই মৃত্যুর মিছিলের বড় একটি অংশের জন্য দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি। প্রায় ৯০ হাজার মৃত্যুর পেছনে সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর বিষাক্ত ধোঁয়া দায়ী, যার মধ্যে ৩০ হাজার মৃত্যু ঘটেছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও কলকারখানার কারণে।
ভয়াবহ তথ্য হলো, ঘরোয়া বায়ুদূষণে প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ৭৪ জন মারা যাচ্ছেন। আধুনিক জ্বালানির অভাব এবং অবৈজ্ঞানিক রান্নার পদ্ধতির কারণে নারী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এই মরণফাঁদে বেশি আটকা পড়ছে।
উপকূলের লবণাক্ততা ও জনস্বাস্থ্য
অনুষ্ঠানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি সরাসরি মানুষের শরীরে আঘাত করছে। উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির অভাব এবং লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা মহামারি আকার ধারণ করছে।" তিনি আরও বলেন, পানির নিরাপত্তাহীনতা ও তাপজনিত চাপ এখন বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের জন্য এক অদৃশ্য লড়াই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী সরকারের কিছু পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে জানান, সাভারকে নিয়ন্ত্রিত বায়ুমান অঞ্চল ঘোষণা করা হয়েছে এবং গৃহস্থালি দূষণ কমাতে বৈদ্যুতিক চুলা জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের ২৫ শতাংশ জ্বালানি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার।
বিনিয়োগ ও অভিযোজনই বাঁচার পথ
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি গ্র্যান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারজানা মিশা জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় (NAP) স্বাস্থ্যকে অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে, ঢাকায় নিযুক্ত সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি নায়োকা মার্টিনেজ ব্যাকস্ট্রম মনে করেন, স্থানীয় প্রেক্ষাপটে সমাধান এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব জোরদার না করলে এই বিশাল ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়াসিস পেরে এবং পিকেএসএফ-এর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে রাব্বী সাদেক আহমেদ অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ ঠেকাতে হলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
অন্ধকার ভবিষ্যতের হাতছানি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন কেবল হিমবাহ গলানো বা সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ানোতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বাংলাদেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পকেট থেকে টাকা কেড়ে নিচ্ছে এবং হাসপাতালগুলোকে কানায় কানায় পূর্ণ করছে। বৈশ্বিক সহায়তা এবং দ্রুত জাতীয় নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ না হলে বাংলাদেশ এক দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ও জীবিকা সংকটে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
শ্রম উৎপাদনশীলতা হারানো এবং অকালমৃত্যুর এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে—সময় আর হাতে নেই। জলবায়ু সংকট এখন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং আমাদের ভবিষ্যতের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে।




Comments