Image description

জলবায়ু পরিবর্তনের এক মহাক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ দেশের চিরসঙ্গী হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর তীব্রতা ও পৌনঃপুনিকতা সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। আর এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দেশের কোমলমতি শিশুরা।

ইউনিসেফের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র-২০২৪ সালে চরম আবহাওয়াজনিত কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কেবল দুর্যোগের কারণেই কোনো কোনো অঞ্চলের শিশুরা বছরে টানা আট সপ্তাহ বা দুই মাস পর্যন্ত স্কুল থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছে। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের “লার্নিং ইন্টারাপ্টেড:  গ্লোবাল স্ন্যাপশট অব ক্লাইমেট-রিলেটেড স্কুল ডিসরাপশন ইন ২০২৪” শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার এই সরাসরি যোগসূত্রটি সামনে আনা হয়েছে। প্রতিবেদনটি বলছে, বিশ্বজুড়ে ৮৫টি দেশের অন্তত ২৪ কোটি ২০ লাখ শিশু শিক্ষা সংকটে পড়লেও সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের নাম দক্ষিণ এশিয়া, যার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ।

প্রকৃতির রুদ্ররোষে থমকে যাওয়া শিক্ষাবর্ষ: ২০২৪ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশ একের পর এক চরম আবহাওয়ার মুখোমুখি হয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসে ইতিহাসের দীর্ঘতম তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ। তীব্র গরমে শিশুদের পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন) ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সরকার সারা দেশে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই মে মাসের শেষে আঘাত হানে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘রেমাল’। উপকূলীয় জেলাগুলোতে শত শত স্কুল ঘর বিধ্বস্ত হয়, যা হাজার হাজার শিশুর স্কুলযাত্রাকে অনিশ্চিত করে তোলে। এরপর জুন মাসে শুরু হয় প্রলয়ংকরী বন্যা। বিশেষ করে সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে বন্যার প্রকোপ ছিল অবর্ণনীয়। ইউনিসেফের তথ্যমতে, বন্যায় সারা দেশে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে ৭০ লাখই ছিল শিশু। অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে সিলেট অঞ্চলে ৬ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া থেকে ঝরে পড়ার উপক্রম হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, কেবল সিলেট অঞ্চলেই জলবায়ুজনিত কারণে শিশুরা বছরে ৮ সপ্তাহ স্কুল দিবস হারিয়েছে। এছাড়া খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগে এই ক্ষতির পরিমাণ ছিল গড়ে ৬ সপ্তাহ।

‘শিখন দারিদ্র্য’ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: শিক্ষা কেবল ক্লাসরুমের চার দেয়ালের বিষয় নয়, এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বারবার স্কুল বন্ধ হওয়ার ফলে শিশুদের মেধা ও মনন বিকাশে স্থায়ী ক্ষত তৈরি হচ্ছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এই পরিস্থিতিকে ‘শিখন দারিদ্র্য’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যখন কোনো শিশু ১০ বছর বয়সেও সহজ লেখা পড়তে বা বুঝতে পারে না, তাকেই শিখন দারিদ্র্য বলা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে স্কুলগামী শিশুদের প্রতি দুইজনে একজন তার শ্রেণি অনুযায়ী পাঠ্যবই পড়তে পারছে না। এমনকি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পরেও দুই-তৃতয়াংশ শিক্ষার্থী মৌলিক গণনায় অক্ষম থেকে যাচ্ছে। জলবায়ু সংকটের কারণে দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিঘ্নিত হচ্ছে শিশুদের মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য।

ঝরে পড়া ও বাল্যবিবাহের নীরব মহামারি: দুর্যোগ কেবল বই-খাতা কেড়ে নিচ্ছে না, এটি কেড়ে নিচ্ছে শৈশবকেও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকলে বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ঝরে পড়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। পরিবারের কর্মক্ষম সদস্য যখন দুর্যোগে নিঃস্ব হয়, তখন আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তারা মেয়েদের বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দেয়। বর্তমানে বিশ্বে বাল্যবিবাহের উচ্চ হারের শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম। মেধাবী ছাত্রীরাও এই সামাজিক ব্যাধির শিকার হয়ে অকালে শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রয়োজন জলবায়ু-সহনশীল শিক্ষা অবকাঠামো: প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিশাল প্রভাব সামাল দেয়ার মতো প্রস্তুতি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নেই। শিক্ষায় জলবায়ু-কেন্দ্রিক বিনিয়োগ এখনও নামমাত্র। এই প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ, দাতা সংস্থা এবং বাংলাদেশের সরকারের প্রতি তিনটি প্রধান সুপারিশ রাখা হয়েছে। 

জলবায়ু সহনশীল অর্থায়ন: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে নির্মাণ বা সংস্কার করতে হবে যেন সেগুলো বন্যা বা ঘূর্ণিঝড় সহনশীল হয় এবং একই সঙ্গে চরম তাপপ্রবাহের সময়ও পাঠদান অব্যাহত রাখার মতো পরিবেশ থাকে।

জাতীয় পরিকল্পনায় শিশু কেন্দ্রিকতা: বাংলাদেশের ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান’ বা জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় শিশুদের শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নেও জোর দিতে হবে।

তরুণদের অংশগ্রহণ: জলবায়ু নীতি প্রণয়নের প্রতিটি স্তরে ভুক্তভোগী শিশু ও তরুণদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশের শিশুরা আজ দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি- একদিকে অস্তিত্ববিনাশী জলবায়ু পরিবর্তন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শিখন দারিদ্র্য। রানা ফ্লাওয়ার্সের ভাষায়, শিশুদের ভবিষ্যৎ আজ হুমকির মুখে। নীতিনির্ধারকদের এখনই তাদের আহ্বানে সাড়া দিতে হবে। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়, তবে সেই মেরুদণ্ডকে জলবায়ু পরিবর্তনের আঘাত থেকে রক্ষা করা এখন কেবল পরিবেশগত দাবি নয়, বরং একটি জাতীয় জরুরি অবস্থা। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে; আজ যদি আমরা শিশুদের শিক্ষার অধিকার রক্ষা করতে না পারি, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ এক মেধাহীন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ধাবিত হবে।