Image description

রাজধানীর মুগদা ও মান্ডা এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে সুজন ওরফে ‘কানা সুজন’। নিজেকে একসময়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের অনুসারী ও ‘ডান হাত’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে সে। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ভাইয়া গ্রুপ’ নামের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

সর্বশেষ গত ১১ এপ্রিল (শনিবার) রাতে মান্ডা এলাকায় জহিরুল ইসলাম আরিয়ান মৃধা নামের এক যুবক ও তার পরিবারের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় কানা সুজনের বাহিনী। আরিয়ানের অপরাধ ছিল—তিনি ও এলাকার কয়েকজন সচেতন যুবক মিলে জামাইটেক এলাকায় প্রকাশ্য মাদক বিক্রি বন্ধে সচেষ্ট হয়েছিলেন এবং মাদক ব্যবসায়ীদের পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিচ্ছিলেন।

হামলার বর্ণনা দিয়ে আরিয়ান মৃধা বলেন, “আমরা এলাকাবাসী মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমাদের এলাকায় মাদক চলতে দেব না। যারা মাদক বিক্রি করে তাদের ধরিয়ে দিচ্ছিলাম। এতেই ক্ষিপ্ত হয় সুজন ও তার বাহিনী। শনিবার রাতে সুজন, রোমান, আকাশ, মেহেদী ও আলামিনসহ একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী আমাদের ওপর চড়াও হয়। রোমান সুইচগিয়ার দিয়ে আমার মুখ চিরে দেয়। সুজনের কাছে পিস্তল ছিল। মাইদুল নামে এক ভাই আমাকে টেনে ভেতরে না নিলে ওরা আমাকে মেরেই ফেলত।” হামলাকারীরা আরিয়ানের বৃদ্ধা চাচির বুকে ইট দিয়ে আঘাত করে গুরুতর আহত করে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তর মুগদাপাড়ার মদিনাবাগ এলাকার বাসিন্দা মো. সুরুজের ছেলে সুজন এলাকায় নিজেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী জাফর আহমেদ মানিকের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে বড় ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালীদের হুমকি দিয়ে আসছে। সে নিজেকে বিএনপি নেতা বলেও দাবি করে, যদিও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, তার কোনো দলীয় পদ-পদবি নেই। এসব পরিচয় শুধু অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আড়াল করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

‘ভাইয়া গ্রুপ’ গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর জান্নাতবাগ এলাকায় এক শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে প্রকাশ্যে ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে। কয়েকদিন আগে মানিকনগরে মোবাইল ছিনতাইয়ের সময় সুজন হাতেনাতে ধরা পড়ে গণধোলাই খায়, কিন্তু তার অপরাধমূলক তৎপরতা থামেনি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সুজন বাহিনীর নেপথ্যে ‘চিপ বাবু’সহ কয়েকজন প্রভাবশালী গডফাদার রয়েছে। তাদের ছত্রছায়ায় ইয়াবা, আইস ও ফেন্সিডিলের রমরমা ব্যবসা চলছে। সুজন এই সিন্ডিকেটের ‘মাঠ পর্যায়ের কমান্ডার’ হিসেবে কাজ করে। যারা মাদক ব্যবসার প্রতিবাদ করে, তাদেরকে হয় মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হয়, নয়তো আরিয়ানের মতো বর্বর হামলার শিকার হতে হয়।

আরিয়ান মৃধা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমি সাধারণ জনগণের কাছে বিচার চাই। আমি মাদক বেচি না, চাঁদাবাজি করি না, এমনকি সিগারেটও খাই না। অথচ আমাকেই অপরাধী বানানোর চেষ্টা চলছে। আমি যদি মারা যাই, তবে এর দায়ভার কানা সুজন ও তার বাহিনীর।”

এলাকাবাসীর দাবি, মুগদা থানা ও ঊর্ধ্বতন পুলিশ প্রশাসন যেন অবিলম্বে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী কানা সুজনসহ তার সহযোগীদের (রোমান, আকাশ, মেহেদী, আলামিন প্রমুখ) গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনে। শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম ভাঙিয়ে রাজধানীর একটি এলাকাকে অশান্ত করার চেষ্টা যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে মুগদা-মান্ডার যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে।

মুগদা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আহসান উল্লাহ মানবকণ্ঠকে বলেন, “গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সুজন ওরফে কানা সুজনকে আমরা গ্রেফতার করে আদালতে পাঠিয়েছিলাম। সেখান থেকে সে জামিনে বেরিয়ে এসেছে বলে শুনেছি। তবে মুগদা-মান্ডা এলাকায় তার বাহিনীর কোনো তাণ্ডব বা সাম্প্রতিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আমি এখনও অবগত নই। যদি এলাকাবাসী লিখিত অভিযোগ দেন বা কোনো নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ অভিযোগ আসে, তাহলে আমরা অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। পুলিশ এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। কেউ যেন কোনো অপরাধ করে পার না পায়, সেজন্য আমরা সতর্ক রয়েছি।”