Image description

গোলাম মাওলা রনি: যার সঙ্গে আলাপ করি সবাই একবাক্যে বলেন, ভালো নেই! শ্রমিক কর্মচারী- শিল্পপতি- আমলা- কামলা থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায়ের ছোট ছোট দোকানদার, সবজি বিক্রেতা, খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের শত-সহস্র পেশাজীবীর ঘুম কিভাবে হারাম হচ্ছে তা যাতে রাষ্ট্রের কর্তাব্যক্তিরা সহজে অনুভব করতে পারেন সে জন্য আজকের নিবন্ধে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বাস্তব ঘটনা বর্ণনা করব।

চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী স্মার্ট গ্রুপের মালিকের বাসার সামনে এসে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যেভাবে একে-৪৭-এর মতো মারাত্মক প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে অবিরত গুলি করে নজিরবিহীন কাণ্ড ঘটাল, তা আমার পাঁচ যুগের জিন্দেগিতে কোনো দিন দেখিনি কিংবা শুনিনি। সন্ত্রাসীরা ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছিল এবং কয়েক দফা হুমকির পর চাঁদার দাবি এক কোটিতে নামিয়ে এনে হতভাগ্য ব্যবসায়ীকে চরমপত্র প্রদান করে। অসহায় ব্যবসায়ী বিষয়টি পুলিশকে জানালে পুলিশ ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে পাহারা দিতে আরম্ভ করে।

এই অবস্থায় সন্ত্রাসীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ঘটনার দিন ভোরে সদলবলে এসে তাণ্ডব চালায়, যার ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ নড়েচড়ে বসে বটে, কিন্তু আজ অবধি তাণ্ডবকারী চাঁদাবাজদের পশম স্পর্শ করার খবর পাওয়া যায়নি।

উল্লিখিত ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখার পর আমি বা আমার মতো লোকজনের আতঙ্ক কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে তা ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। আমরা যারা দীর্ঘদিন ব্যবসা-বাণিজ্য করি এবং কর্মসূত্রে বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছি বটে, কিন্তু গত করোনা কাল—ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কবলে পড়ে কতটা ভিখিরির জীবনযাপন করছি তার কিছু নমুনা পেশ করছি। আমাদের গাড়ি-বাড়ির দাম হয়তো শতকোটি, কিন্তু ব্যাংকে দেনার পরিমাণ কয়েক শতকোটি।

অনেকে জায়গা-জমি, গয়নাগাঁটি বিক্রি করে ব্যাংকের দেনা পরিশোধ অথবা ব্যবসা চালিয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে কতটা শারীরিক ও মানসিক জটিলতায় পড়েছেন যে তাদের দেখলে মনে হবে যেন একেকটা জীবন্ত কঙ্কাল।

সুতরাং কোনো সন্ত্রাসী যদি শুধু বাড়ি-গাড়ি টার্গেট করে চাঁদা দাবি করে বসে সে ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা কী বিপদে পড়তে পারেন তা নিয়ে গিন্নির সঙ্গে হালকা একটু রসালাপ করার চেষ্টা করতেই আমার অর্ধাঙ্গিনী ভয়ে আতঙ্কে জীবন্ত লাশ হয়ে গেলেন। 

চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ীর বাড়ির সামনে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী তাণ্ডবের ভিডিও চিত্র দেখিয়ে তাকে যখন বললাম—সন্ত্রাসীরা বাসায় ঢুকে যখন অস্ত্র উঁচিয়ে বলবে—‘দে’ যা কিছু আছে তাড়াতাড়ি বের কর! গিন্নি আমার সহজ সরল ভাষায় বললেন—সন্ত্রাসীদের বলব, ভাই! বাসায় দশ হাজার টাকাও নেই। আমি বললাম—সাবধান! ও কথা ভুলেও বলবে না।

কারণ ওরা মেজাজ হারিয়ে গালি দেবে এবং কেউ কেউ চড়-থাপ্পড়ও বসিয়ে দিতে পারে। তারা গালি দেওয়ার সময় আবহমান বাংলার কদর্য শব্দ ব্যবহার করবে এবং বলবে...গি! এত বড় বাড়িতে থাকো! এত দামি গাড়িতে চড়ো! আবার ঢং করে বলো বাসায় দশ হাজার টাকাও নেই। এরপর যদি একে-৪৭ দিয়ে তোমাকে-আমাকে বেদম প্রহার করে তখন কী করবে?

উপরোক্ত কথাগুলো নেহাত কৌতুকের ছলে বলতে গিয়ে আমি নিজেই ভয় পেয়ে গেলাম আর আমার স্ত্রীর ব্লাড প্রেসার বেড়ে গেল। আমরা নির্বাক দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে রইলাম, যা আমাদের ৪০ বছরের বিবাহিত জীবনে কোনো দিন ঘটেনি।

বিগত সরকার অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের জামানার মব সন্ত্রাস-দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে পৌঁছা ব্যাংকিংব্যবস্থা এবং সরকারি অফিস-আদালতে ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তাদের মনোবল যেভাবে ভেঙে গেছে, তা বর্তমানে রীতিমতো জাতীয় হতাশায় পরিণত হয়েছে।

ইংরেজিতে যেটাকে বলা হয় ন্যাশনাল গ্রেট ডিপ্রেশন, তা বহুবার ইউরোপ আমেরিকাকে তছনছ করে দিয়েছে। বাংলাদেশে যেহেতু উন্নত বিশ্বের মতো ব্যবসা-বাণিজ্য এর আগে ছিল না। তাই আমরা অনেকেই জানি না যে গ্রেট ডিপ্রেশনের কুফলগুলো কী এবং ডিপ্রেশন কিভাবে একটি দেশের অর্থনীতিতে সুনামি ঘটিয়ে থাকে। অথচ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা যে অর্থনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে আছি তা আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে এর আগে ঘটেনি।

আমাদের অর্থনীতির প্রাণ ভ্রমরা হলো দেশীয় শিল্প-কলকারখানার উৎপাদন এবং বিপণনে নিয়োজিত শ্রমশক্তি। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, ভোগ এবং বিনিয়োগের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির গতি ও প্রকৃতি। 

ইউনূসের জামানায় দেশের যত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানিতেও হয়নি। একই সময়ে দেশের ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের যেভাবে অপমান-অপদস্থ করা হয়েছে তা ফ্যাসিস্ট মুসোলিনির জামানায় ইতালিতে ঘটেনি। 

অন্যদিকে মব সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি, অন্যের সহায়সম্পত্তি দখলের জন্য যে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করা হয়েছে, তা আইয়ামে জাহেলিয়াতের জামানায় অথবা হালাকু খান যেদিন বাগদাদ দখল করেছিল সেদিন ঘটেছিল কি না তা আমি বলতে পারব না। তবে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর রাজনীতিবিদ, আমলা, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ আমজনতার ওপর যে মব সন্ত্রাস চালানো হয়েছে তা বাংলাদেশের সভ্যতার চাকাকে উল্টোপথে ঘুরিয়ে দিয়েছে। কত প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে, কত প্রতিষ্ঠান বেদখল হয়েছে এবং কত প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে তা যদি বের করা যেত, তবে অর্থনীতির সুনামির ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যেত।

চলমান দুরবস্থার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ। এই যুদ্ধ যদি মাত্র দুই সপ্তাহ চলে, তবে আমাদের অর্থনীতি যে কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে তা আন্দাজ করা অসম্ভব। এমনিতেই আমাদের ঘর-গৃহস্থালি এবং শিল্প-কারখানা মারাত্মক গ্যাসসংকটে ভুগছে। কিছুদিন আগেও এলপিজি সিলিন্ডারের অভাবে সারা দেশে রান্নার চুলা জ্বলেনি। সরকার থেকে তখন বলা হচ্ছিল যে আমাদের এলএনজির বিরাট অংশ ইরান থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে আমদানি করা হয়। আমেরিকা যেহেতু ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সেহেতু এলপিজির সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে।

দেশে যখন এলপিজি সিলিন্ডারের সমস্যা তীব্র হচ্ছিল তখন সরকারের সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তার সঙ্গে একটি রেস্টুরেন্টে দেখা হলো, যেখানে তিনি সস্ত্রীক খেতে এসেছিলেন। বিরস বদনে ভদ্রলোক জানালেন, গত এক সপ্তাহ ধরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও একটি সিলিন্ডার জোগাড় করতে পারিনি। ফলে বৈদ্যুতিক ইনফ্রারেড চুলা দিয়ে কোনোমতে চালাচ্ছি। গত কয়েক দিন ঠিকমতো খানাপিনা হয়নি, তাই আজ একটু ভালোমন্দ খাওয়ার জন্য হোটেলে এসেছি।

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলেই যদি আমাদের এলপিজি এবং এলএনজিনির্ভর অর্থনীতি, গৃহস্থালি, শিল্প-কলকারখানার বেহাল নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তাহলে চলমান ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ কী ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে তা কল্পনা করলে গা শিউরে ওঠে। এরই মধ্যে ইরান তাদের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। ইসরায়েলসহ পার্শ্ববর্তী আরব দেশসমূহে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত-কাতার-কুয়েত-সৌদি আরব-বাহরাইন প্রভৃতি দেশের তেল সরবরাহ মারাত্মক হুমকির মুখে। 

মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর চীন-জাপান-ইউরোপ-আমেরিকায় রীতিমতো কান্নার রোল পড়ে গেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। বড় বড় শেয়ারবাজার, স্বর্ণের বাজার, বিশ্বের শক্তিশালী মুদ্রাসমূহের দরপতনে বিশ্ব অর্থনীতি যখন থরথর করে কাঁপছে, তখন ফ্যামিলি কার্ড এবং খাল কাটা কর্মসূচির সফলতা আদৌ কি পাব।

লেখক:
রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক