নারায়ণগঞ্জে ভয়ঙ্কর খুনি-সন্ত্রাসীদের টার্গেটে র্যাব-পুলিশ
নারায়ণগঞ্জ শহরের মাসদাইরসহ আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে সন্ত্রাসীদের জনপদ গড়ে উঠেছে। মাদক, ছিনতাই, হত্যা সহ নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অ্যাকশনে গেলে উল্টো তাদের ওপর হামলা করে ভয়ঙ্কর খুনি সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীন থেকে শুরু করে জাহিদ গ্রুপ ও বুইট্টা মাসুদ গ্রুপের লোকজন তাণ্ডব চালিয়ে র্যাব ও পুলিশের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা চালিয়ে আসছে। সবশেষ নারায়ণগঞ্জে র্যাব ও পুলিশের ওপর হামলা করার দুটি ঘটনায় নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। ফলে এ নিয়ে নানা মহলে ভীতি ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, গত ৫ মে মঙ্গলবার দুপুরে র্যাব-১১ এর চার সদস্যের একটি টিম শহরের মাসদাইর বোয়ালিয়া খাল এলাকায় গিয়ে নানা তথ্য সংগ্রহ করার সময় এক দল সন্ত্রাসী র্যাব সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে ধারালো অস্ত্রসহ ধাওয়া দেয় ও তিন জন সদস্যকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আহত র্যাব সদস্যরা হলেন; ইব্রাহিম, মাহী ও নাজিবুল। চিকিৎসার জন্য তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে র্যাব অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক, অস্ত্র সহ ১৩ জনকে আটক করে।
এই ঘটনার মাত্র একদিনের ব্যবধানে ৬ মে বিকেলে শহরের মাসদাইর এলাকার পার্শ্ববর্তী দেওভোগ হাশেমবাগ এলাকায় সাবেক পুলিশ সদস্যের বাড়ির তালা ভেঙে মালামাল লুট করে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ৫ জনকে আটক করে। এ খবর পেয়ে আটক সন্ত্রাসীদের সহযোগিরা হামলা চালিয়ে পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেয়।
এই দুটি ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জাহিদ, রনি ও বুইট্টা মাসুদ গ্রুপের সন্ত্রাসীরা জড়িত রয়েছে বলে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস ও মাদক সাম্রাজ্যের নানা আলোচনা উঠে আসে। এছাড়া দুই দশকের বেশি সময় ধরে এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীনের উত্থান:
নব্বইয়ের দশকের শেষ সময়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের গলাচিপা ও মাসদাইর সহ আশেপাশের এলাকার সন্ত্রাসী মনিরুজ্জামান শাহীন ওরফে বন্দুক শাহীনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসীপনা ছিল তার মূল কাজ। ১৯৯৬ সালে পুলিশের একটি থ্রি নট বন্দুক লুট করার পর শাহীনের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় বন্দুক শব্দটি। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে শাহীন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ২০১৩ সালে পুরো জেলার ইয়াবা ও ফেনসিডিলের একক আধিপত্য চলে আসে বন্দুক শাহীনের কাছে। তখন থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর হামলা করতো শাহীনের লোকজন।
২০১৩ সালের ৩ মে মাসদাইরে একই স্থানে ডিবির অভিযানের সময় তাদের উপর হামলা করে শাহীনের লোকজন। ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে শাহীনকে আটক করতে শাহীনের লোকজন র্যাব সদস্যদের ডাকাত আখ্যা দিয়ে মারধর করে এবং তাদের একটি মটরসাইকেল পুকুরে ফেলে দেয়। ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শাহীন সহ আরো ১০-১২জন অস্ত্র নিয়ে পুলিশের উপর হামলা করে।
২০১৭ সালের ১৩ অক্টোবর সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ডিবির প্রায় ১২ মিনিটি ধরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এক সময়ে শাহীন ক্রসফায়ারে মারা যান। পুলিশের ভাষ্য মতে, ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শহরের গলাচিপা এলাকায় বন্দুক শাহীনের মাদকের আস্তানায় অভিযান চালাতে গেলে পুলিশের ওপর হামলা চালায় শাহীন ও তার সহযোগীরা। দুই পক্ষের গোলাগুলিতে শাহীন নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি ৭ পয়েন্ট ৬৫ বোরের পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। শাহীনের বিরুদ্ধে একাধিক থানায় হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজিসহ ১২টির বেশি মামলা রয়েছে।
আলোচিত হত্যাকাণ্ডের খুনিরা অধরা:
সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীনের জনপদ হিসেবে পরিচিত মাসদাইর এলাকায় আলোচিত ব্যবসায়ী সাব্বির আলম খন্দকারকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। জানা গেছে, ২০০২ সালের ২২ অক্টোবর সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদক মুক্ত করার জন্য নারায়ণগঞ্জ চেম্বারে অনুষ্ঠিত জেলার ৩২টি ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে সেনাবাহিনীর মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় অংশ গ্রহণ করার আহবান জানিয়ে বক্তব্যে সাব্বির সেদিন সন্ত্রাসী মাদক ব্যবসায়ীদের নাম, ঠিকানা ও তাদের গডফাদারদের নাম প্রকাশ করেন।
এ ঘটনার চার মাস পর ২০০৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী সকালে মাসদাইরে নিজ বাড়ির অদূরে মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত রোকেয়া খন্দকার স্কুল থেকে বের হওয়ার ৫ থেকে ৭ গজ দূরেই আক্রান্ত হন সাব্বির আলম খন্দকার। অজ্ঞাত দুই সন্ত্রাসী প্রথমে সাব্বিরকে লক্ষ্য করে ২ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। সাব্বির তখন দৌড় দিলে সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে খুব কাছ থেকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য গুলি ছোড়ে। পিঠে, পেটে, মাথায় ও হাতে ২১টি গুলির চিহ্ন রয়েছে। তার মৃত্যুর পর থেকে এখন পর্যন্ত দুই খুনির সন্ধান মেলেনি। পরিচয় উন্মোচিত হয়নি।
সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীনের মৃত্যুর পর জাহিদ গ্রুপের উত্থান:
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীনের মৃত্যুর পর হাতবদল হয়ে তারই ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত জাহিদ, মাসুদ ওরফে ‘বুইট্টা মাসুদ’ ও খাঁজা রনি -এর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় মাসদাইরের মাদকের স্পটগুলো। মূলত জাহিদ গ্রুপের সাব গ্রুপ হলো বুইট্টা মাসুদ ও রনি গ্রুপ। পরবর্তীতে তারা সেখানে মাদকের নতুন সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। আর সেই সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে অস্ত্র ও সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলে।
গত বছরের ১৫ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় মাসদাইর এলাকায় নাসিক ১৩নং ওয়ার্ড কৃষক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক নাহিদুর রহমান পারভেজের ওপর ছুরিকাঘাত ও গুলিবর্ষণ করে জাহিদ গ্রুপের জাহিদ ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় আসামিদের গ্রেফতার করতে
১৬ নভেম্বর র্যাব-১১ এর একটি গোয়েন্দা দল শহরের মাসদাইরের গাইবান্ধা বাজার এলাকায় পৌঁছালে জাহিদ ও তার সহযোগীরা র্যাবের গোয়েন্দাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি ছুড়ে। এসময় জাহিদের ছোড়া গুলি স্থানীয় এক বাড়ির রান্নাঘরে থাকা জবা আক্তার (২২) নামে এক গৃহবধূর বুকে এসে লাগে। পরে তাকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
গত বছরের ২৪ জুলাই ফতুল্লা মডেল থানার এসআই সামছুল হক সরকার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে মাসদাইর ঘোষের বাগ এলাকায় মাদক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি জাহিদকে গ্রেপ্তার করতে যান। জাহিদকে ঘটনাস্থলে না পেয়ে তারা যখন ফিরে আসছিলেন, তখনই পেছন থেকে জাহিদের সহযোগীরা এসআই সামছুল হক সরকারের ডান হাতের কনুইয়ের নিচে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ছুরিকাঘাতে আহত এসআই সামছুল হক সরকারকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
গত বছরের ১৮ মার্চ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জাহিদ, সুমনসহ চার জন আসামিকে গ্রেফতার করে। এর কিছুক্ষণ পর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সেলিম ওরফে কসাই সেলিম, রাসেল ওরফে কসাই রাসেল, কাজল, রিয়াদ শাওন, সানি, হাসান সহ ১৫-২০ জনের মাদক কারবারিদের একটি গ্রুপ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় হামলাকারীরা হ্যান্ডকাফ পরিহিত গ্রেফতারকৃত চার মাদক ব্যবসায়ীকে ছিনিয়ে নেয় এবং গাড়ী ভাঙচুর করে। মাদক কারবারিদের হামলায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কনেস্টেবল আহত হয়। এ ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার করে।
এছাড়া ২০১৬ সালে গলাচিপা এলাকায় জাহিদ, খাঁজা রনি ও বুইট্টা মাসুদদের হামলার শিকার হন ডিবি পুলিশের সদস্যরা।
নারায়ণগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হাসিনুজ্জামান মানবকণ্ঠকে বলেন, জাহিদ গ্রুপের প্রধান জাহিদের বিরুদ্ধে হত্যা সহ অন্তত অর্ধ ডজন মামলা রয়েছে। এই সন্ত্রাসী এখন আত্মগোপনে রয়েছে। তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির গ্রুপ বুইট্ট মাসুদ, রনি ওরা জাহিদ গ্রুপের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। মূলত এক সময়ের সন্ত্রাসী বন্দুক শাহীন এই এলাকার মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী ছিল, শাহীনের মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন জাহিদ গ্রুপ। তারা ওই এলাকায় মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। একারণে মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধানকে গ্রেফতার সহ নানা পদক্ষেপ নিয়ে পুলিশ কাজ করছে।




Comments