Image description

'মা’—একটি ছোট শব্দ, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে জন্ম, নিরাপত্তা, মমতা আর অস্তিত্বের বিশাল গল্প। মানুষের জীবনের প্রথম আশ্রয় এবং ভাষার উৎস হলেন মা। যুগের পর যুগ ধরে বিভিন্ন সভ্যতায় মাকে শ্রদ্ধা জানানোর রীতি থাকলেও, আধুনিক বিশ্বে ‘বিশ্ব মা দিবস’ সেই চিরন্তন অনুভূতির এক বৈশ্বিক স্বীকৃতি। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হয়।

মাতৃত্বকে সম্মান জানানোর ইতিহাস বেশ পুরনো। প্রাচীন গ্রিসে মাতৃদেবী রিয়ার পূজা এবং রোমান সভ্যতায় দেবী সাইবেলির উৎসব ছিল মাতৃত্বেরই উদযাপন। ইংল্যান্ডে প্রচলিত ছিল ‘মাদারিং সানডে’। তবে আধুনিক মা দিবসের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় উনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকায়। সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়ার্ড হো এবং অ্যান রিভস জার্ভিস নারীদের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে কাজ শুরু করেন।

অ্যান রিভস জার্ভিসের মৃত্যুর পর তাঁর মেয়ে আনা জার্ভিস মায়ের স্বপ্ন পূরণে ব্রতী হন। ১৯০৮ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস পালন করেন তিনি। সেদিন তিনি তাঁর মায়ের প্রিয় সাদা কার্নেশন ফুল দিয়ে সকলকে আপ্যায়িত করেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে ‘জাতীয় মা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন।

মা দিবস যে আবেগ আর অকৃত্রিম ভালোবাসার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা দ্রুতই ফুল, কার্ড আর উপহারের ব্যবসায় পরিণত হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন খোদ আনা জার্ভিস। তিনি চেয়েছিলেন সন্তানরা যেন নিজ হাতে মাকে চিঠি লিখে শ্রদ্ধা জানায়, কেবল কেনা উপহারে নয়। বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি প্রায় নিঃস্ব হয়ে ১৯৪৮ সালে মারা যান।

সময়ের সাথে সাথে মায়ের সংজ্ঞা ও ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয়েছে। আজকের মা কেবল ঘর সামলানো মানুষটি নন; তিনি একাধারে শিক্ষক, কর্মজীবী নারী, উদ্যোক্তা এবং সমাজ পরিবর্তনের কারিগর।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় মা: আমাদের দেশের মায়েরা ঘরের অদৃশ্য শ্রমের পাশাপাশি মাঠ-ঘাট, অফিস-আদালত কিংবা করপোরেট দুনিয়ায় সমান তালে কাজ করছেন। গ্রামে কৃষিকাজ থেকে শুরু করে শহরে প্রশাসনিক দায়িত্ব—সবখানেই মায়ের ভূমিকা প্রধান।

এত অর্জনের মাঝেও বর্তমান যুগের মায়েদের লড়তে হয় একাকীত্ব, ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার সাথে। অনেক মা বৃদ্ধাশ্রমে একা থাকেন, আবার অনেক ‘সিঙ্গেল মাদার’ শত বাধা পেরিয়ে সন্তানকে মানুষ করছেন।

উপহার কিংবা উদযাপন যেভাবেই হোক, মা দিবসের মূল শিক্ষা হলো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। পৃথিবীতে সময়ের সাথে অনেক সম্পর্কের সংজ্ঞা বদলে যায়, কিন্তু সন্তানের জন্য মায়ের ভালোবাসা থাকে চিরন্তন। মা কেবল একজন মানুষ নন, তিনি প্রতিটি সন্তানের কাছে তার প্রথম পৃথিবী।