Image description

মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগে দেশটির বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ঐতিহাসিক আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়া। চলতি সপ্তাহে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে এই মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরু হয়েছে।

শুনানিতে যা বলা হলো
সোমবার (১২ জানুয়ারি) মামলার চূড়ান্ত শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী দাউদা এ জালো আইসিজে বিচারকদের বলেন, মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘পুরোপুরি ধ্বংস করার লক্ষ্য’ নিয়েছিল। প্রায় এক দশক আগে শুরু হওয়া সেই সামরিক অভিযানে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ছেড়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। শরণার্থীরা সেই সময়ে নির্বিচারে হত্যা, গণধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের বীভৎস বর্ণনা দিয়েছিলেন।

আইসিজে-র পিস প্যালেসে এক আবেগঘন মুহূর্তে জালো সেখানে উপস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে বলেন। ১৫ জন বিচারপতির প্যানেল তখন তাদের স্বীকৃতি দেন। এই প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিচার হচ্ছে এবং কোনো তৃতীয় দেশ অন্য কোনো দেশের জনগোষ্ঠীর পক্ষে গণহত্যার মামলা লড়ছে।

কেন মামলা করল গাম্বিয়া?
২০১৯ সালের নভেম্বরে গাম্বিয়া প্রথম মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের ‘জেনোসাইড কনভেনশন’ লঙ্ঘনের দায়ে মামলা করে। মাত্র ২৫ লাখ মানুষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দেশটি মূলত ৫৭ সদস্যের ওআইসি-র (ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা) প্রতিনিধি হিসেবে এই পদক্ষেপ নেয়।

এই মামলার নেপথ্যের কারিগর ছিলেন গাম্বিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবুবকর তামবাদু। তিনি বর্তমানে জাতিসংঘে উচ্চপদে কর্মরত। ইতিমধ্যে কানাডা, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও ব্রিটেনসহ সাতটি দেশ গাম্বিয়ার এই মামলাকে সমর্থন জানিয়েছে।

গাম্বিয়ার নিজস্ব অভিজ্ঞতাই কি অনুপ্রেরণা?

গাম্বিয়া কেন এতো দূর থেকে এসে এই মামলা লড়ছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পেছনে গাম্বিয়ার নিজস্ব ইতিহাস কাজ করছে। দেশটির সাবেক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া জামেহর ২২ বছরের শাসনামলে গাম্বিয়ানরা চরম দমন-পীড়ন ও গুম-খুনের শিকার হয়েছিল। ২০১৭ সালে জামেহর পতনের পর গাম্বিয়া নিজের দেশে ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ গঠন করে। ঠিক সেই সময়েই রোহিঙ্গা সংকটের তীব্রতা বাড়ে। গাম্বিয়ার তৎকালীন কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, মানবাধিকার রক্ষা একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব। নিজেদের কষ্টের অভিজ্ঞতাই তাদের রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

গাম্বিয়ার যুক্তি ও মিয়ানমারের অবস্থান
গাম্বিয়ার আইনজীবীরা আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান, মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ‘নিকৃষ্ট ও অমানুষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়েছে। পুড়িয়ে মারা, গণধর্ষণ ও নির্বিচারে গুলির মাধ্যমে তাদের জাতিগত পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের পক্ষে প্রতিনিধি দল আজ শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) থেকে তাদের পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শুরু করবে। এর আগে ২০১৯ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি সশরীরে আদালতে উপস্থিত হয়ে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তবে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সু চি এখন কারাগারে। বর্তমান জান্তা সরকারও দাবি করছে যে, তারা কোনো গণহত্যা করেনি, বরং তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছিল।

রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থা
মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না; বরং তাদের ‘বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে গণ্য করে। বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজারে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছে। সম্প্রতি মার্কিন সরকারসহ আন্তর্জাতিক দাতাদের তহবিল কমানোর ফলে সেখানে খাদ্য ও শিক্ষা সংকট তীব্র হয়েছে। উপায়ান্তর না দেখে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বহু রোহিঙ্গা সাগরপথে অন্য দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে, যা প্রায়শই সলিল সমাধির কারণ হচ্ছে।

এই মামলার প্রভাব কী?
আইসিজে কোনো রায় কার্যকর করতে বাধ্য করতে পারে না, তবে এর সিদ্ধান্তের ব্যাপক আন্তর্জাতিক আইনি গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মামলার রায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা ফিলিস্তিনিদের গণহত্যা মামলার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমানে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে আইসিজে-র চূড়ান্ত রায়ের দিকে, যা নির্ধারণ করবে মিয়ানমারকে তাদের কৃতকর্মের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে কতটুকু জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে।

তথ্যসূত্র: আলজাজিরা