পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, নতুন চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইরানের হাতে "সময় শেষ হয়ে আসছে"। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতিও বাড়ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, একটি বিশাল নৌবহর অত্যন্ত শক্তি, উৎসাহ এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত গতিতে ইরানের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তাদের সশস্ত্র বাহিনী "ট্রিগারে আঙুল রেখে" প্রস্তুত রয়েছে। স্থল বা জলপথে যেকোনো ধরনের আগ্রাসনের "তাত্ক্ষণিক ও শক্তিশালী জবাব" দেওয়া হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির যে অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা করে আসছে, তেহরান তা বারবার অস্বীকার করেছে।
অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ ও মানবাধিকার পরিস্থিতি
ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এল, যখন তিনি চলতি মাসের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর চালানো নজিরবিহীন ক্র্যাকডাউনে হস্তক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ইরানি মুদ্রার ব্যাপক দরপতনের ফলে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দ্রুত দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বের বৈধতার সংকটে রূপ নেয়।
ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, "সাহায্য আসছে"। তবে পরে তিনি জানান যে, নির্ভরযোগ্য সূত্রে তিনি জানতে পেরেছেন বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া বন্ধ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, গত ডিসেম্বরের শেষ থেকে শুরু হওয়া এই অস্থিরতায় এ পর্যন্ত ৫,৯২৫ জন বিক্ষোভকারীসহ মোট ৬,৩০১ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি তারা নিশ্চিত করেছে। এছাড়া ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকায় আরও ১৭,০০০ মৃত্যুর খবর তারা তদন্ত করছে। নরওয়েভিত্তিক সংস্থা 'ইরান হিউম্যান রাইটস' সতর্ক করেছে যে, প্রকৃত নিহতের সংখ্যা ২৫,০০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্পের নতুন অবস্থান ও সামরিক প্রস্তুতি
ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ লিখেছেন, "আশা করি ইরান দ্রুত আলোচনার টেবিলে আসবে এবং একটি ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক চুক্তিতে পৌঁছাবে—কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়।"
তিনি উল্লেখ করেন, এবার উপসাগরে পাঠানো নৌবহরটি ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় পাঠানো বাহিনীর চেয়েও বড়। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এই বাহিনী প্রয়োজনে "দ্রুততা ও চরম সহিংসতার মাধ্যমে" মিশন সম্পন্ন করতে সক্ষম।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন, "পরবর্তী আক্রমণ হবে আরও ভয়াবহ! এমন পরিস্থিতি তৈরি করবেন না।"
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেট ফরেন রিলেশনস কমিটিকে বলেছেন, "ইরানের শাসনব্যবস্থা বর্তমানে ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কারের কোনো পথ নেই।" তিনি জানান, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক অবস্থান মূলত মার্কিন কর্মীদের রক্ষা করার জন্য।
ইরানের প্রতিক্রিয়া
আব্বাস আরাগচি বলেন, ইরান সবসময় একটি পারস্পরিক লাভজনক ও ন্যায্য পারমাণবিক চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে তা হতে হবে কোনো ধরনের হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন ছাড়াই। তিনি পুনরায় বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ইরানের নিরাপত্তা কৌশলে নেই এবং তারা কখনোই তা অর্জনের চেষ্টা করেনি।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি জানিয়েছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে না, তবে "বার্তাপ আদান-প্রদান" অব্যাহত রয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাই-এর পর্যবেক্ষণ
বিবিসি ভেরিফাই স্যাটেলাইট ইমেজ এবং ওপেন-সোর্স টুল ব্যবহার করে নিশ্চিত করেছে যে:
জর্ডানের মুওয়াফফাক বিমানঘাঁটিতে অন্তত ১৫টি মার্কিন ফাইটার জেট পৌঁছেছে।
কাতার, জর্ডান এবং ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটিতে কার্গো ও রিফুয়েলিং বিমানের আনাগোনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন বিমানবাহী রণতরীর নেতৃত্বে একটি বিশাল নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে।
জবাবে ইরানও তাদের 'শহীদ বাঘেরি' নামক ড্রোনবাহী জাহাজ উপকূলের কাছে মোতায়েন করেছে।
প্রেক্ষাপট
২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি অনুযায়ী, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তিনি এই চুক্তি থেকে সরে আসেন এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়ে। জবাবে ইরানও চুক্তির শর্ত ভেঙে উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, যেকোনো নতুন চুক্তিতে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ‘মিডনাইট হ্যামার’ কোডনেমে ইরানের ফোরডো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহান স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল। ইরান তখন এর প্রতিশোধ নিতে কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, যাকে ট্রাম্প "দুর্বল পদক্ষেপ" বলে অভিহিত করেছিলেন।




Comments