মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের লেলিহান শিখা কেবল জ্বালানি তেলের বাজারকেই অস্থির করেনি, বরং বিশ্বকে এক ভয়াবহ খাদ্যসংকটের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ খ্যাত হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ায় সারের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত ২ মার্চ ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। কিন্তু এর সমান্তরালে সারের বাজারে যে ধস নেমেছে, তা আরও বেশি উদ্বেগজনক। উল্লেখ্য, বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ইউরিয়া সারের প্রায় অর্ধেক এবং অন্যান্য সারের বড় একটি অংশ এই প্রণালি দিয়েই রপ্তানি হয়।
সার উৎপাদনে অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলার পর দেশটি বিশ্বের বৃহত্তম ইউরিয়া উৎপাদন কেন্দ্রটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশে ৫টি সার কারখানার মধ্যে ৪টিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতও তাদের ৩টি বড় ইউরিয়া কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও সারের সরবরাহ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
সংকটের সুযোগে সারের দাম হু হু করে বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি হওয়া ইউরিয়ার দাম মেট্রিক টন প্রতি ৫০০ ডলার থেকে বেড়ে ৭০০ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেশি। শিপিং সেবা প্রতিষ্ঠান সিগন্যাল গ্রুপের তথ্যমতে, বিশ্বের ৪৬ শতাংশ ইউরিয়া একাই সরবরাহ করে উপসাগরীয় দেশগুলো। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশই মুখ থুবড়ে পড়বে।
সারের এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে এশিয়ায়। ভারত তার প্রয়োজনীয় সারের ৪০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনে। ব্রাজিল প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর, যার অর্ধেক আসে হরমুজ দিয়ে। বর্তমানে উত্তর গোলার্ধে ফসলের বীজ বপন মৌসুম (ফেব্রুয়ারি-মে) চলায় সারের এই অভাব কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সারের ব্যবহার কমলে ধান, গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে।
ভারত (চাল ও গমের শীর্ষ রপ্তানিকারক), ব্রাজিল (সয়াবিন ও চিনির বড় উৎপাদক) এবং চীনের মতো দেশগুলোতে উৎপাদন কমলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে দেখা দিতে পারে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্ভিক্ষ ও খাদ্য হাহাকার।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ দ্রুত না থামলে বিশ্ববাসী কেবল অন্ধকারের মুখোমুখি হবে না, বরং ক্ষুধার এক নজিরবিহীন মহামারির কবলে পড়বে।
মানবকণ্ঠ/আরআই




Comments