গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যেই এক মাস অতিক্রম করে দু’মাসে গড়িয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রাণহানি আর ধ্বংসযজ্ঞ। মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক এই সংঘাত অচিরেই শেষ হবে, এমন কোনো সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান এই যুদ্ধের একেবারে কেন্দ্রে চলে এসেছে হরমুজ প্রণালি, যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয় বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথকে ঘিরে বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রায় শুরু থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ যদি শেষ হয়েও আসে, হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বাণিজ্যে অস্থিরতা মাসের পর মাস স্থায়ী হতে পারে। আর এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে জাহাজে পণ্য পরিবহন খাতে বড় ধরণের পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটি খুলে দেওয়ার পরও বিশ্ববাজারে এর প্রভাব দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
জার্মান শিপিং কোম্পানি হ্যাপাগ-লয়েডের কর্মকর্তা নিলস হাউপ্ট বলছেন, যুদ্ধ শেষ হলে লজিস্টিকস সংকট আরও বড় পরিসরে সামনে আসবে। হরমুজ প্রণালি খুলে গেলেই সব স্বাভাবিক হবে না। শত শত জাহাজ একসঙ্গে উপসাগরীয় বন্দরগুলোয় ঢোকার চেষ্টা করলে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জ্বালানি ও পণ্যবাহী জাহাজ এই অঞ্চলে আটকা পড়েছে। এর মধ্যে ওমান উপসাগরে অপেক্ষা করছে প্রায় ৪০০ জাহাজ।
বর্তমানে অনেক পণ্যবাহী জাহাজ বিকল্প পথ হিসেবে সুয়েজ খাল বা আফ্রিকার দক্ষিণে কেপ অব গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে যাতায়াত করছে। ফলে একদিকে পণ্য পরিবহণের সময় বেশি লাগছে, অন্যদিকে পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়ছে।
ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্য বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে হামলা-পাল্টা হামলায় ৪০টির বেশি জ্বালানি স্থাপনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের জ্বালানি কোম্পানিগুলো জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত পূরণ করা সম্ভব না। তাই তেল ও গ্যাস সরবরাহ আগের পরিস্থিতিতে ফিরতে কয়েক মাস, এমনকি বছরও লাগতে পারে।
শুধু হরমুজ প্রণালি খোলা নয়, জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুদ্ধের সময় জাহাজে হামলার ঘটনায় বীমা খরচ ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক কোম্পানি আগামীতে বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে বাধ্য হবে বলে ধারণা করছেন তারা।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে এই সংকট বিশ্ববাণিজ্যে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। বেশ কিছু দেশ ও জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যেই জ্বালানি পরিবহণের জন্য বিকল্প পথ ও পাইপলাইন ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে।




Comments