Image description

পৃথিবীর কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান নভোচারীদের সবসময়ই চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—প্রয়োজন হলে কত দ্রুত একটি ক্ষতিগ্রস্ত মহাকাশ স্টেশন ত্যাগ করা যায়।

গত বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ‘ক্রু-১১’ মিশনের চার নভোচারী প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেন। এই চারজনের মধ্যে একজন হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, যার চিকিৎসা মহাকাশ স্টেশনের সীমিত সম্পদে সম্ভব ছিল না। ফলে পুরো দলটিকে জরুরি ভিত্তিতে মহাকাশ স্টেশন খালি করে পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মাইক ফিঙ্ক ও জেনা কার্ডম্যান, জাপানের কিমিয়া লুই এবং রুশ নভোচারী ওলেগ প্লাতোনভ ২০২৫ সালের আগস্টে মহাকাশ স্টেশনে গিয়েছিলেন। সাড়ে ছয় মাস থাকার পরিকল্পনা থাকলেও একজনের চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি অবস্থার কারণে পুরো দলটিকে স্পেস-এক্সের ক্যাপসুলে করে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরতে হয়েছে।

এই ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে, মহাকাশ অভিযান কখনোই সাধারণ কোনো ভ্রমণ নয়। স্টার ট্রেকের ভাষায় বলতে গেলে, মহাকাশ হলো অন্ধকার আর নিস্তব্ধতায় মোড়ানো রোগ আর বিপদের এক আধার।

প্রশিক্ষণ যখন জীবন বাঁচায়
কল্পনা করুন, মাঝরাতে প্রচণ্ড সাইরেনের শব্দে আপনার ঘুম ভাঙলো। আপনি মহাকাশ স্টেশনের একটি ছোট কেবিনে স্লিপিং ব্যাগে আটকা পড়ে আছেন। বাইরে থেকে কোনো ধ্বংসাবশেষের আঘাতে স্টেশনের দেয়ালে ছিদ্র হয়ে অক্সিজেন বেরিয়ে যাচ্ছে, অথবা বিষাক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রকৃত নভোচারীদের এসব কল্পনা করতে হয় না, তারা মাটিতে বসানো ‘আইএসএস সিমুলেটর’-এ বারবার এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ইউকে স্পেস এজেন্সির এক্সপ্লোরেশন ম্যানেজার মেগান ক্রিশ্চিয়ান বলেন, "প্রশিক্ষণের সময় তারা আপনাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলে দেবে। হুট করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হবে বা অ্যামোনিয়া লিকেজ তৈরি করা হবে। তারা মূলত দেখতে চায়, একসাথে অনেকগুলো বিপদ এলে আপনি কতটা শান্ত থেকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।"

ফেরি শিপ: মহাকাশের জীবন রক্ষাকারী ‘ট্যাক্সি’
১৯৬৬ সাল থেকেই নাসা মহাকাশে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা করে আসছে। হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের জোনাথন ম্যাকডোয়েল বলেন, "মহাকাশ গবেষণার একটি মৌলিক নিয়ম হলো—আপনার বাড়ির দরজায় সবসময় একটি ‘ফেরি শিপ’ বা ক্যাপসুল প্রস্তুত রাখা। স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলে আপনাকে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করতে হবে না; আপনার পাশেই একটি যান সবসময় তৈরি থাকে।"

তবে এই ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, যদি দলের একজন সদস্যও অসুস্থ হন, তবে সেই যানের পুরো দলটিকে ফিরে আসতে হয়। কারণ কাউকে মহাকাশে একা ফেলে আসা সম্ভব নয়।

ধীরে চলো নীতি
নভোচারী নিকোল স্টট তার ‘ব্যাক টু আর্থ’ বইয়ে লিখেছেন, জরুরি অবস্থায় নভোচারীদের মূলমন্ত্র হলো—‘দ্রুত কাজ করার জন্য ধীরে চলো’। অর্থাৎ সাইরেন বাজার সাথে সাথেই আতঙ্কিত না হয়ে শান্তভাবে প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করা। প্রথমে অক্সিজেন মাস্ক পরা, আগুনের উৎস খুঁজে বের করা এবং ধাপে ধাপে মডিউলগুলো বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে (ক্যাপসুলে) চলে যাওয়া।

মেগান ক্রিশ্চিয়ানের মতে, "পালানোর ক্যাপসুলটি কেবল পালানোর পথ নয়, এটি একটি নিরাপদ দুর্গও। সেখান থেকে নভোচারীরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনে স্টেশন ত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন।"

চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানে নতুন চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে মাত্র কয়েক ঘণ্টার দূরত্বে। কিন্তু মানুষ যখন চাঁদ বা মঙ্গল গ্রহে বসতি গড়ার চিন্তা করছে, তখন ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। চাঁদ থেকে ফিরতে লাগবে অন্তত তিন-চার দিন, আর মঙ্গল গ্রহ থেকে ফেরার কোনো উপায় নেই যতক্ষণ না পরবর্তী দুই বছর পর ফিরতি যান আসে।

ম্যাকডোয়েল সতর্ক করে বলেন, "মঙ্গল অভিযানের জন্য আমাদের কেবল ফার্স্ট এইড বক্স থাকলে চলবে না, পুরো একটি হাসপাতাল মডিউল নিয়ে যেতে হবে। কারণ সেখান থেকে জরুরি ভিত্তিতে ফিরে আসা অসম্ভব।"

সক্ষমতার ঘাটতি
এদিকে গবেষক গ্র্যান্ট কেটস মহাকাশে উদ্ধার তৎপরতার একটি ‘সক্ষমতা ঘাটতি’র কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, যদি কোনো বাণিজ্যিক মহাকাশযান বিপদে পড়ে, তবে তাদের উদ্ধার করার মতো ‘টোয়িং কোম্পানি’ বা উদ্ধারকারী কোনো সংস্থা মহাকাশে নেই।


সামনের দিনগুলোতে নাসা ‘আর্টেমিস-২’ মিশন লঞ্চ করতে যাচ্ছে, যা ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো মানুষকে চাঁদের ওপাশে নিয়ে যাবে। এই অভিযানে কোনো বিকল্প ক্যাপসুল বা জরুরি উদ্ধার পরিকল্পনা নেই। যদি কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, তবে সেই অন্ধকার ও নিঃশব্দ মহাকাশে নভোচারীদের সহায়তার জন্য কেবল গ্রাউন্ড কন্ট্রোল ছাড়া আর কেউ থাকবে না।