Image description

চারপাশে ঘন কুয়াশা, হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস। পথচলা মানুষের গায়ে মোটা জ্যাকেট আর মাফলার। অথচ এমন আবহাওয়ার মধ্যেই হয়তো রাস্তার ধারের কোনো আইসক্রিম পার্লারে তরুণ-তরুণীদের ভিড়, কিংবা কারো হাতে শোভা পাচ্ছে ঠাণ্ডা আইসক্রিমের কোণ। শীতে আইসক্রিম খাওয়া অনেকের কাছেই এক ধরণের রোমাঞ্চকর বিলাসিতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অভ্যাস কি শরীরের জন্য ভালো, নাকি অজান্তেই ডেকে আনছে বিপদ?

শীতে আইসক্রিম খাওয়া নিয়ে তর্ক বহুদিনের। বাড়ির মুরুব্বিরা যেখানে শীতে আইসক্রিম দেখলেই রেগে আগুন হন, সেখানে তরুণ প্রজন্মের যুক্তি—শীতেই তো আইসক্রিম খাওয়ার আসল মজা! চলুন, বিজ্ঞানের লেন্স দিয়ে দেখে নেওয়া যাক এই অভ্যাসের ভালো-মন্দ।

শীত ও আইসক্রিম: বিজ্ঞান কী বলে?
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় আইসক্রিম খেলে সরাসরি সর্দি-কাশি হয় না। সর্দি বা ফ্লু মূলত ভাইরাসজনিত রোগ। তবে, অতিরিক্ত ঠান্ডা খাবার গলার ভেতরের তাপমাত্রা হঠাৎ কমিয়ে দেয়, যা স্থানীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। এতে ভাইরাসের আক্রমণ সহজ হয়।

খারাপ দিকগুলো কী কী?
টনসিলের সমস্যা: যাদের টনসিলের সমস্যা বা ক্রনিক সর্দি-কাশির ধাত আছে, তাদের জন্য শীতে আইসক্রিম ‘বিষের’ সমান। এটি গলার গ্ল্যান্ড ফুলিয়ে দিতে পারে এবং তীব্র ব্যথার সৃষ্টি করতে পারে।
দাঁতের শিরশিরানি: শীতে এমনিতেই দাঁত সংবেদনশীল থাকে। এর মধ্যে অতিরিক্ত ঠান্ডা আইসক্রিম দাঁতের এনামেলের ক্ষতি করতে পারে এবং তীব্র শিরশিরানি বা ব্যথার কারণ হতে পারে।
রক্ত সঞ্চালনে বাধা: শরীর যখন নিজেকে গরম রাখার চেষ্টা করছে, তখন পেটে অতিরিক্ত ঠান্ডা খাবার গেলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হয়। এতে হজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ক্যালোরি ও চিনির আধিক্য: শীতে আমাদের নড়াচড়া বা কায়িক পরিশ্রম কমে যায়। এই সময়ে আইসক্রিমের অতিরিক্ত চিনি ও ফ্যাট শরীরে জমে ওজন বাড়িয়ে দিতে পারে।

কোনো উপকার আছে কি?
অবাক করা হলেও সত্য, শীতে আইসক্রিম খাওয়ার কিছু ইতিবাচক দিকও আছে—যদি তা পরিমিত এবং সঠিক উপায়ে খাওয়া হয়।
গলার আরাম: অদ্ভুত শোনালেও, গলায় সামান্য খসখসে ভাব বা প্রদাহ থাকলে প্লেইন ভ্যানিলা বা দুধের তৈরি আইসক্রিম কিছুটা আরাম দিতে পারে। এটি গলার টিস্যুকে অসাড় করে সাময়িক স্বস্তি দেয়।
মুড বুস্টার: শীতে সূর্যের আলো কম থাকায় অনেকের ‘উন্টার ব্লুজ’ বা মন খারাপের সমস্যা হয়। আইসক্রিম শরীরে ‘এন্ডোরফিন’ হরমোন নিঃসরণ করে, যা নিমেষেই মন ভালো করে দিতে পারে।
শরীর গরম করা: বিশ্বাস করা কঠিন হলেও, আইসক্রিমে থাকা ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট হজম করার সময় শরীর প্রচুর শক্তি খরচ করে, যা শেষমেশ শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বাড়াতে সাহায্য করে।

কাদের জন্য কঠোর বারণ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবার জন্য নিয়ম এক নয়। তবে নিচের সমস্যাগুলো থাকলে শীতে আইসক্রিম থেকে ১০০ হাত দূরে থাকাই শ্রেয়:
যাদের অ্যাজমা বা হাঁপানির সমস্যা আছে।
যাদের সাইনাস বা মাইগ্রেনের ব্যথা শীতে বেড়ে যায়।
ডায়াবেটিস রোগী (চিনির কারণে)।
যাদের বুকে কফ জমে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

শীতে আইসক্রিম খাওয়ার সঠিক নিয়ম
শখের বসে যদি আইসক্রিম খেতেই হয়, তবে কিছু সতর্কতা মেনে চলুন:
সময় নির্বাচন: ভরদুপুর বা বিকেল—যখন তাপমাত্রা কিছুটা সহনীয় থাকে, তখন খান। গভীর রাতে বা কুয়াশায় দাঁড়িয়ে খাবেন না।
ধীরে খান: তাড়াহুড়ো করে গিলবেন না। মুখে কিছুক্ষণ রেখে গলিয়ে তারপর গিলুন, যাতে গলার তাপমাত্রার সাথে মানিয়ে নিতে পারে।
পানি পান: আইসক্রিম খাওয়ার পর অবশ্যই এক গ্লাস সাধারণ তাপমাত্রার বা কুসুম গরম পানি পান করুন। এতে গলা বসে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

শীতে আইসক্রিম খাওয়া মানেই অসুখ নয়, আবার এটি স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারীও নয়। বিষয়টি নির্ভর করে আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। যদি সুস্থ-সবল হন এবং ঠান্ডা লাগার ধাত না থাকে, তবে মাঝেমধ্যে এই ‘শীতল’ আনন্দ উপভোগ করতেই পারেন। তবে মনে রাখবেন, পরিমিতিই হলো সুস্থতার চাবিকাঠি।