শহরের ব্যস্ত জীবন হোক বা গ্রামের শান্ত সন্ধ্যা এক মুহূর্তের অসতর্কতা কেড়ে নিতে পারে সবকিছু। রান্নাঘরের চুলা, পুরনো বৈদ্যুতিক তার, কিংবা একটি জ্বলন্ত সিগারেটের অবশিষ্টাংশ; আগুনের সূত্রপাত ঘটে চোখের সামনেই, অথচ আমরা টের পাই অনেক দেরিতে। প্রতিবছর অসংখ্য অগ্নিকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, দুর্ঘটনার পরে আফসোস করার চেয়ে আগেই প্রস্তুতি নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ। আপনার ঘর ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে আজই নিচের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন।
স্মোক ডিটেক্টর ও অ্যালার্ম: আগাম বিপদের সংকেত
আগুনের প্রথম শত্রু ধোঁয়া। আগুন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠার আগেই ধোঁয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং নিঃশব্দে বিপদ ডেকে আনে। তাই ঘরের প্রতিটি তলায় এবং বিশেষ করে শোবার ঘরের আশেপাশে স্মোক ডিটেক্টর বসানো জরুরি। মাসে অন্তত একবার এটি পরীক্ষা করুন এবং বছরে অন্তত একবার ব্যাটারি বদলে ফেলুন। ঘুমের মধ্যে আগুনের সংকেত পেতে এর কোনো বিকল্প নেই।
ফায়ার এক্সটিংগুইশার বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র
আগুন ছোট থাকতেই যদি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। রান্নাঘর বা ঘরের প্রবেশপথের কাছে একটি ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখুন এবং পরিবারের সবাইকে এর ব্যবহার শিখিয়ে দিন। তবে মনে রাখবেন, আগুন যদি আয়ত্তের বাইরে চলে যায়, তবে নেভানোর চেষ্টা না করে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
রান্নাঘরের বিশেষ সতর্কতা
অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের উৎস হলো রান্নাঘর। রান্নার সময় চুলা ছেড়ে অন্য কোথাও যাবেন না। গ্যাসের পাইপ ও রেগুলেটর নিয়মিত পরীক্ষা করুন। যদি কড়াইয়ের তেলে আগুন লেগে যায়, তবে সেখানে কখনোই পানি দেবেন না; বরং ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দিন অথবা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করুন।
বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও তারের সুরক্ষা
পুরনো জরাজীর্ণ তার, এক সকেটে অনেকগুলো প্লাগ সংযোগ বা নিম্নমানের এক্সটেনশন কর্ড আগুনের প্রধান কারণ হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত তার দেখা মাত্রই বদলে ফেলুন। ঘুমানোর আগে বা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সুইচ বন্ধ রাখুন। মনে রাখবেন, বৈদ্যুতিক আগুনে পানি দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক; এ ক্ষেত্রে প্রথমেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে।
দাহ্য বস্তু ও শিশুদের নিরাপত্তা
দেশলাই, লাইটার, পারফিউম স্প্রে বা যেকোনো দাহ্য রাসায়নিক শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন। পর্দা, কাপড় বা কাগজ যেন চুলা বা হিটারের খুব কাছে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। ছোটদের আগুন নিয়ে খেলা করতে দেবেন না, বরং আগুনের কুফল সম্পর্কে তাদের ছোটবেলা থেকেই সচেতন করুন।
জরুরি নির্গমন পথ ও মহড়া
আগুন লাগলে আতঙ্কে আমরা অনেক সময় দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তাই আগে থেকেই ঘর থেকে বের হওয়ার অন্তত দুটি পথ ঠিক করে রাখুন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বছরে অন্তত একবার ‘ফায়ার ড্রিল’ বা মহড়া দিন। মনে রাখবেন, ঘরে ধোঁয়া জমলে নিচু হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে দ্রুত বের হতে হবে, কারণ নিচে বাতাস পরিষ্কার থাকে। কোনো বদ্ধ দরজা খোলার আগে হাত দিয়ে দরজার তাপমাত্রা পরীক্ষা করুন; যদি গরম লাগে তবে সেই পথ এড়িয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করুন।
জরুরি মুহূর্তের প্রস্তুতি
ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি সেবার নম্বর (যেমন: ৯৯৯) ফোনের কন্টাক্ট লিস্টে রাখুন এবং চোখের সামনে কোথাও লিখে রাখুন। টর্চলাইট বা ইমার্জেন্সি লাইট সবসময় হাতের কাছে রাখুন। পরিবারের শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্যদের নিরাপদে বের করে আনার দায়িত্বটি আগেই নির্দিষ্ট করে রাখুন।
শেষ কথা
আগুন কোনো সতর্কবার্তা দিয়ে আসে না, কিন্তু আমাদের সচেতনতা ও প্রস্তুতি বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। নিজের ঘরকে নিরাপদ রাখা মানে কেবল সম্পদ রক্ষা নয়, বরং প্রিয়জনদের জীবন রক্ষা করা। আজই এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলো নিন—আগুনের আগেই সুরক্ষিত হোক আপনার ঘর।
Comments