ভোটারদের জবরদস্তি করলে প্রভাব পড়ে স্থিতিশীলতায়: ব্রিটিশ এমপি ব্ল্যাকম্যান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে প্রস্তাবিত গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ব্রিটিশ এমপি বব ব্ল্যাকম্যান। তাঁর মতে, গণভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন বা জবরদস্তির মাধ্যমে প্রভাবিত করার যে কোনো প্রচেষ্টা গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী উল্লেখ করে ব্ল্যাকম্যান বলেন, এতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স জানায়, বুধবার লন্ডনের হাউস অব লর্ডসে ‘বাংলাদেশ অ্যাট দ্য ক্রসরোডস’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে এসব মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ব্ল্যাকম্যান বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে বিক্ষোভ ও শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনা আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। তবে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরবর্তী ঘটনাবলি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
তিনি বলেন, রাজনীতিতে বিরোধী দলগুলোর অনুপস্থিতি, তাদের বাদ দিয়ে পরিচালিত আইনি কার্যক্রম এবং বিরোধী নেতাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।
ব্ল্যাকম্যান জোর দিয়ে বলেন, “যে কোনো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি এবং জনগণের আস্থার ওপর।” জনমত জরিপের তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, বাংলাদেশের জনগণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো এমন রাজনৈতিক দলগুলোকে সমর্থন করে, যারা বর্তমানে স্বাধীনভাবে নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারছে না।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বাধা দেওয়া হলে গণতন্ত্র নিজেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।” তাঁর মতে, বর্জন, নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক বঞ্চনা শেষ পর্যন্ত প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে।
যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের গভীর ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করে ব্ল্যাকম্যান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যের সমর্থনের বিষয়টি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম দিকের আন্তর্জাতিক সফরগুলোর একটি ছিল যুক্তরাজ্যে, যা দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের প্রতীক।
মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ব্ল্যাকম্যান হিন্দু, খ্রিস্টান ও সংখ্যালঘু মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার কথা তুলে ধরেন। হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ এবং ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় ধ্বংসের ঘটনাগুলো কেবল সোশাল মিডিয়ার গুজব নয়, বরং বাস্তব ভুক্তভোগীদের নিয়ে নথিভুক্ত তথ্য—এমন মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আহ্বান জানান, এসব বিষয়ে স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রাখতে এবং ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের কাছ থেকে আরও কঠোর নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করতে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তুলে ধরার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন এই ব্রিটিশ এমপি।
হাউস অব লর্ডসের কমিটি রুম–৩-এ অনুষ্ঠিত এই সেমিনারটির আয়োজন করেন লর্ড রামি রেঞ্জার। যৌথভাবে আয়োজন করে পলিটিকা নিউজ, সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স এবং নর্থ্যাম্পটন ব্রিটিশ বাংলাদেশি বিজনেস চেম্বার। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন কাউন্সিলর নাজ ইসলাম, সভাপতিত্ব করেন লর্ড রামি রেঞ্জার এবং সেমিনার পরিচালনা করেন পলিটিকা নিউজের প্রধান সম্পাদক তানভীর আহমেদ। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর গ্লোবাল পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সঞ্জয় কুমার রায়।
মানবকণ্ঠ/আরআই




Comments