Image description

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে মঙ্গলবার অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দায়িত্ব শেষ হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, ‘এখন আমার যাওয়ার পালা।’

জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘শুরুতেই আমি বাংলাদেশের সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ, ভোটার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্মিলিতভাবে একটি প্রশংসনীয় নজির সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্বাচন কেমন হওয়া উচিত, এই নির্বাচন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে থাকবে।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘বিগত ১৮ মাস আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন শেষে একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আজ আমি আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উপস্থিত হয়েছি। আজ বিদায়ের দিনে ৫ আগস্টের কথা স্মরণ করে আপনাদের কিছু কথা বলব। কী মহামুক্তির দিন ছিল সেদিনটি! সে কী আনন্দের দিন! বাংলাদেশিরা দেশে-বিদেশে যে যেখানে ছিল, আনন্দে চোখের পানি ফেলেছে। দৈত্যের গ্রাস থেকে তরুণ ছাত্রছাত্রীরা দেশকে বের করে এনেছে। দেশ মুক্ত হয়েছে। কিন্তু দেশ ছিল সম্পূর্ণ অচল। অচল এই দেশটিকে কীভাবে সচল করা যাবে, সেটিই ছিল সবার মনে বড় প্রশ্ন।’

নিজে দায়িত্ব নেওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা ঠিক করল দেশকে সচল করার জন্য একটি সরকার লাগবে। সরকার গঠন ও চালানোর জন্য তারা আমাকে খবর দিল। আমি তখন বিদেশে। আমি শুরুতে দায়িত্ব নিতে রাজি ছিলাম না। তারা জাতির প্রতি কর্তব্য পালনের কথা বলে আমাকে রাজি করাল। ১৮ মাস পর এখন আমার যাওয়ার পালা। আমি আজ আমার কাজ হতে বিদায় নিতে আপনাদের সামনে এসেছি।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। এটি ছিল সবচাইতে কঠিন কাজ। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত, তারাই দেশের এই যন্ত্র চালাত। তাদের একান্ত অনুগত লোক নিয়ে অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে সবাই পালিয়েছে। বড় কর্তা পালিয়েছে, মাঝারি কর্তা পালিয়েছে। অন্যরা ভোল পাল্টিয়েছে অথবা আত্মগোপনে চলে গেছে। কেউ নানাজনের সুপারিশ নিয়ে আসছিল যে তারা অভ্যুত্থানের গোপন সৈনিক। সরকারের ভেতরে যারা পালিয়ে যায়নি, তাদের মধ্যে কাকে বিশ্বাস করবেন আর কাকে করবেন না—এটি মহাসংকট হয়ে দাঁড়াল। যতই মৃতদেহের ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন দেহের সন্ধান আসছিল, ততই অপরাধীরা চিহ্নিত হচ্ছিল।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘সেই থেকে ১৮ মাস পার হয়েছে। অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি এল। দেড় যুগ পর দেশে একটি জাতীয় নির্বাচন এবং ব্যাপক সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য সর্বসম্মত জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হলো। এই নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ ও দেশের সর্বত্র একটা ঈদের আমেজ ছিল, যা আমাদের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

নির্বাচনে জয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন, তাদের আমি অভিনন্দন জানাচ্ছি। যারা পরাজিত হয়েছেন, তাদেরও অভিনন্দন জানাই। হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন। যারা জয়ী হতে পারেননি তারাও মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেয়েছেন। আপনারা এই জেনে আশ্বস্ত হবেন যে প্রায় অর্ধেক ভোটার আপনাদের ওপর আস্থা রেখেছে। আগামীকাল নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে, এর মাধ্যমেই আমাদের ১৮ মাসের দায়িত্বের সমাপ্তি হবে।’