সাবেক সেনা কর্মকর্তা মাসুদের জিম্মি খেলায় আশিয়ানের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট, ঋণের ফাঁদে শিল্প গ্রুপ
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান আশিয়ান গ্রুপ। গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়ার অভিযোগ, সাবেক সেনা কর্মকর্তা (অব.) মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মো. মাসুদের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট অস্ত্রের মুখে তাকে জিম্মি করে আশিয়ান গ্রুপের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে এবং কয়েক হাজার বিঘা জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছে।
নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, আশিয়ান গ্রুপ জলসিঁড়ি-১ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নিজস্ব জমি দিয়ে শুরু করে বালুভরাট, রাস্তাঘাট নির্মাণ, এলাকাবাসীর কাছ থেকে জমি ক্রয় এবং সার্বিক উন্নয়নমূলক কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন তিনি। এলাকাবাসীর বিরোধিতা সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণভাবে তাদের আস্থা অর্জন করে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি সফল করেন। সেনাবাহিনীকেও সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়েছেন তিনি। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নের পর সেনাবাহিনীকে ভুল বুঝিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের তৎকালীন চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল সাঈদ মাসুদ। উদ্দেশ্য ছিল আশিয়ান গ্রুপের বিনিয়োগ করা অর্থ না দিয়ে জলসিঁড়ি প্রকল্পের পাশে আশিয়ান সিটির ক্রয়কৃত আরও ১২০০ বিঘা জমি জবরদখল করা।
অভিযোগ অনুসারে, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আশিয়ান সিটির দেড় হাজার বিঘা জমি বন্ধক রেখে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ তুলে নেন জেনারেল মাসুদ ও তার সিন্ডিকেট। আশিয়ান গ্রুপ এই ঋণের এক কানাকড়িও ভোগ করেনি, অথচ এখন বিশাল ঋণের বোঝা বইতে হচ্ছে গ্রুপকে। পাশাপাশি আশিয়ান গ্রুপের ক্রয়কৃত ১২০০ বিঘা দখল করা জমির উপর নির্মাণাধীন জলসিঁড়ি-২। একদিকে সেনাবাহিনীর জন্য নিবেদিতপ্রাণ সহযোগিতা, অন্যদিকে প্রতারণা ও জবরদখলের শিকার হয়ে চরম ক্ষতির সম্মুখীন হন নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তিনি গত ১৭ বছর স্বাভাবিক ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেননি। অথচ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হয়েছে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে।
আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, এই সিন্ডিকেটে সাবেক আরও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। তাদের নামও পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করে আইনের আওতায় আনা হবে।
জলসিঁড়ি প্রকল্পের আড়ালে আশিয়ানের জমি দখল ও অর্থ আত্মসাৎ : রাজধানীর হাতিরঝিল ও জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পের আড়ালে ভয়াবহ দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মূলহোতা ছিলেন আবু সাঈদ মো. মাসুদ। ভুক্তভোগীদের দাবি, জলসিঁড়ি প্রকল্পের অর্ধেকেরও বেশি জমি ছিল আশিয়ান গ্রুপের। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি আশিয়ানের জমি জবরদখল করেন।
নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। বিগত ১৭ বছর আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তিনি শক্ত প্রতিবাদ করেছেন এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই অপরাধে সাবেক মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মাসুদের নির্দেশে আশিয়ান গ্রুপের ওপর অমানুষিক অত্যাচার চালানো হয়।
ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ভূঁইয়াকে বিমানবন্দর থেকে আটকে তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে জলসিঁড়ি প্রকল্পের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে চোখ বেঁধে গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘরে’ আটকে রেখে চালানো হয় অমানুষিক মানসিক নির্যাতন। একপর্যায়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আশিয়ান গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও হিসাব বিভাগের কর্মীদের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট (ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও এবি ব্যাংক) থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা জোরপূর্বক তুলে নেন।
সৈয়দপুরের বাসিন্দা এবং রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের সাবেক ছাত্র সাঈদ মাসুদ একসময় পদ্মা সেতু প্রকল্পে কনসালটেন্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ তিনি লন্ডনে পাচার করে সেখানে বসবাসরত পরিবারের কাছে পাঠিয়েছেন।
এছাড়াও, নিয়মবহির্ভূতভাবে বসুন্ধরা গ্রুপকে কয়েক হাজার বিঘা সরকারি জমি দখল করিয়ে দেওয়ার নেপথ্যেও সাঈদ মাসুদের ভূমিকা ছিল। এর বিনিময়ে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেন হয় এবং সেই সরকারি জমি এখনও বসুন্ধরা গ্রুপের সীমানার ভেতরে রয়েছে। রূপগঞ্জ এলাকার সাধারণ মানুষের জমিও তিনি অস্ত্রের মুখে বা ভয় দেখিয়ে জলসিঁড়ির নামে লিখিয়ে নিতেন। কেউ প্রতিবাদ করলে বিশেষ সংস্থার ভয় দেখিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো।
বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকায় গত বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) আবু সাঈদ মো. মাসুদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই আদেশ দেন। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থসহ তিনি আত্মগোপনের চেষ্টা করছিলেন।
আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান বর্তমান সরকারের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়ে বলেন, আশিয়ান গ্রুপের দখল করা জমির সঠিক ও ন্যায্য দাম ফিরিয়ে দেওয়া হোক। দ্বিতীয়ত, চেয়ারম্যানকে জিম্মি করে আশিয়ান সিটির জমি বন্ধক রেখে তোলা ব্যাংক ঋণের অর্থ জেনারেল মাসুদ ও তার সিন্ডিকেটের কাছ থেকে আদায় করা হোক। তৃতীয়ত, লুটপাট করা হাজার হাজার কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে উদ্ধার করে পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, এসব অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে গ্রুপটি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বর্তমান সরকার দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে ব্যবসায়ীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করবে।




Comments