২০২৫ সালে দেশে হাম প্রতিরোধমূলক টিকাদানে বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেছে। মাত্র ৫৬.২% শিশু টিকা পেতে সক্ষম হয়েছে, অর্থাৎ ৪৩.৮% শিশু এখনও টিকার বাইরে রয়ে গেছে—এটি গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হার হিসেবে ধরা হচ্ছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা গেছে, আগের বছরগুলোতে হামের টিকাদান কভারেজ অনেক বেশি ছিল। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩ সালে ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ, ২০২২ সালে ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২০ সালে ৯৩ দশমিক ২ শতাংশ, ২০১৯ সালে এই হার ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০১৮ সালে ছিল ৯৮ শতাংশ এবং ২০১৭ সালে ১১৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এমনকি করোনা মহামারির সময়ও টিকাদানের হার তুলনামূলক বেশি ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের সার্বিক টিকাদান কর্মসূচির তথ্য পাওয়া যায়। তবে ২০২৫ সালে হামের টিকাদানের তথ্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ এবছর কোন কার্যক্রম ছিল না বললেই চলে।
গত বছর সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব থাকা ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান টিকাদান কভারেজে হোঁচটের কথা স্বীকার করে বলেন, গত বছর হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্টরা তিন দফায় কর্মবিরতি পালন করেন, যা টিকাদান কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে অনেক স্বাস্থ্য সহকারীর চাকরি চলে যায়। পরে মাত্র ২৩ জেলায় সীমিত সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও দেশের অধিকাংশ এলাকায় পদগুলো এখনও শূন্য রয়েছে। এতে মাঠ পর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া টিকা পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনাতেও জটিলতা দেখা দিয়েছে, যা সার্বিকভাবে টিকাদান কভারেজ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বড় অংশ শিশু টিকার বাইরে থাকায় ভবিষ্যতে হামের সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু কোনো ডোজ টিকা নেয়নি বা আংশিক টিকা নিয়েছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণের আশঙ্কা বেশি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই পতনের পেছনে অন্যতম কারণ ‘অ্যাক্টিভ ক্যাম্পেইন’ বন্ধ হয়ে যাওয়া। সাধারণত শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে এই টিকার দুই ডোজ দেওয়া হয়। আগে যারা টিকাকেন্দ্রে যেতে পারত না, তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া হতো।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে ঘাটতির ফলে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। এসব ‘মিসিং’ শিশু ধীরে ধীরে সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে এবং কয়েক বছর পর বড় আকারে প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ বলেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কমপক্ষে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে এই হার ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। ফলে কয়েক লাখ শিশু ঝুঁকিতে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাবও এখন দৃশ্যমান। পূর্ববর্তী সময়ে অপারেশনাল প্ল্যান ও লাইন ডিরেক্টর কাঠামো বাতিল করে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তরের ফলে স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সংকট নিরসনে দ্রুত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রেখে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে নমুনা পরীক্ষা জরুরি। এটা কোনো ভাইরাসও হতে পারে।
ড. জিয়াউদ্দিন আরও বলেন, হামের চিকিৎসা মূলত সহায়ক চিকিৎসা– জ্বর নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা। এগুলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই সম্ভব। তবে পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবে রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে, যা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ জরুরি। একই সঙ্গে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে নিয়মিত টিকাদান জোরদার করা, ঝরে পড়া শিশুদের শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনা এবং সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, হামের টিকাদান কভারেজ বাড়াতে শিগগিরই বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পিছিয়ে পড়া শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হবে।
তবে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হামের সংক্রমণ আরও বেড়ে শিশুস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যের বিষয়ে অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশিদ একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিলেও সাড়া মেলেনি।
এ বিষয়ে কথা বলতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসকে একাধিকবার ফোন দেওয়ার পরও সাড়া মেলেনি।




Comments