Image description

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা দলীয় পরিচয়ের চেয়েও ব্যক্তিত্ব, নৈতিকতা ও দীর্ঘদিনের সংগ্রামের কারণে আলাদা করে আলোচিত। মাহমুদুর রহমান মান্না তেমনই একজন ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আজ শুভাকাঙ্ক্ষীদের বড় একটি অংশ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে—তিনি যদি ঢাকা ১৮ আসন থেকে নির্বাচন করেন, তবে তাঁর বিজয় অনিবার্য। এই প্রত্যাশা কেবল আবেগনির্ভর নয়; বরং পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা, সততা, গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজধানীর মানুষের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগেরই প্রতিফলন।

ডাকসুর দুইবারের ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ছাত্ররাজনীতির উত্তাল সত্তরের দশক থেকেই নেতৃত্বের পরিচয় দিয়ে আসছেন। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল রাজনৈতিক চিন্তা ও আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। মান্না সেই সময় শুধু সংগঠক হিসেবেই নয়, চিন্তাশীল ও যুক্তিবাদী কণ্ঠ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর বক্তব্যে ছিল স্পষ্টতা, ভাষায় ছিল শৈল্পিক বাচনভঙ্গী, আর আচরণে ছিল অমায়িকতা—যা আজও অটুট।

বগুড়ার সন্তান হলেও ঢাকার রাজনীতিতে মান্না বেশি পরিচিত—এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। রাজধানী ঢাকায় তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত মানুষ। টকশোতে তাঁর উপস্থিতি মানেই দর্শকদের আগ্রহ বৃদ্ধি। যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা এবং সত্যের পক্ষে নির্ভীক অবস্থান তাঁকে টেলিভিশনের পর্দায় সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বক্তাদের একজন করে তুলেছে। তাঁর সত্যতা নিয়ে কখনোই বড় কোনো প্রশ্ন ওঠেনি—এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

রাজনীতিতে আজীবন সততার সঙ্গে চলা সহজ নয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো বাস্তবতায়। নীতিগত কারণে তিনি কোনো দলে দীর্ঘদিন স্থায়ী হতে পারেননি—এটা তাঁর ব্যর্থতা নয়, বরং তাঁর শক্তি। আপস না করার মানসিকতা, আদর্শে অবিচল থাকা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে অনড় অবস্থান তাঁকে অনেক সময় একা করেছে, কিন্তু কখনোই ছোট করেনি। বরং ব্যক্তি হিসেবে তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান—যার ভিত্তি সততা, সাহস ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।

বাংলাদেশের সর্বমহলে মান্নার গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনৈতিক মতাদর্শে ভিন্নতা থাকলেও ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতায় তিনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এই গ্রহণযোগ্যতাই তাঁকে ঢাকা ১৮ আসনের জন্য স্বাভাবিক ও শক্তিশালী প্রার্থী করে তোলে। ঢাকা ১৮—একটি বহুমাত্রিক জনপদ, যেখানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে শ্রমজীবী মানুষ, তরুণ ভোটার থেকে প্রবীণ নাগরিক—সবারই প্রতিনিধি দরকার এমন একজন মানুষ, যিনি কথা বলেন স্পষ্টভাবে, শোনেন মনোযোগ দিয়ে এবং সিদ্ধান্ত নেন বিবেক দিয়ে। মান্না সেই মানদণ্ডে পুরোপুরি মানানসই।

দেশে-বিদেশে তাঁর অসংখ্য শুভাখাঙ্খি ও ভক্ত রয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিশেষ করে তাঁকে আলাদা করে দেখেন—কারণ তিনি আন্তর্জাতিক পরিসরেও দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে সক্ষম। জার্মানিতে বসবাসরত একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি দেখেছি, প্রবাসী মহলে মান্নার নাম উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। তাঁরা চান, তিনি রাজধানী ঢাকা থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে আরও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখুন।

জাতীয় রাজনীতিতে মান্নার প্রায় ৫৫ বছরের ভূমিকা কোনো ছোট অর্জন নয়। তিনি কেবল আন্দোলনের রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং চিন্তার রাজনীতিতে তাঁর অবদান সমান গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোতে তিনি বরাবরই আপসহীন। আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন রাজনীতিতে আদর্শের সংকট অনুভব করে, তখন মান্নার মতো ব্যক্তিত্ব তাদের কাছে আশার বাতিঘর হতে পারেন।

ঢাকা ১৮ থেকে মান্নার নির্বাচন করা মানে শুধু একটি আসনের লড়াই নয়; এটি হবে নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির পক্ষে একটি প্রতীকী ঘোষণা। তাঁর বিজয় ঠেকাতে পারবে—এমন শক্তি বাস্তবে খুব কমই আছে, যদি মানুষ তাদের প্রত্যাশা ও আস্থাকে ভোটে রূপ দেয়। শুভাখাঙ্খিদের এই দাবি তাই সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত তাঁরই। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী থাকে—যখন সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায় দাঁড়ান, তখন পরিবর্তন অনিবার্য হয়। ঢাকা ১৮ আজ এমনই এক সুযোগের অপেক্ষায়। মাহমুদুর রহমান মান্না যদি সেই আহ্বানে সাড়া দেন, তবে তা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত যাত্রা হবে না—তা হবে একটি নৈতিক রাজনৈতিক আন্দোলনের নতুন অধ্যায়।

লেখক: মাহমুদুর রহমান মান্নার ৭০ দশকের সহকর্মী ও জার্মান প্রবাসী সাংবাদিক।