প্রচণ্ড দাপদাহ-অতিষ্ঠ প্রাণ এর মধ্যে লেডিশেডিং চলছে। তপ্ত পরিবেশে পাখা, লাইট ও কলকারখানার কার্যক্রম অস্বাভাবিক হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২৪ জেলা অতিমাত্রায় লোডশেডিং কবলিত, জানা গেছে ঢাকায় ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য লোডিশেডিং পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
বিদ্যুতের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এক ধরনের বিপত্তি সৃষ্টি হয়েছে অনেক আগে থেকেই! বাইরের দেশ থেকে বিদ্যুৎ আসছে। চাহিদার তুলনায় তা পর্যাপ্ত নয়। পিডিবি কয়েকদিন আগে জানিয়েছে রাত ১২টা পর্যন্ত একদিনে ২ হাজার ১৬৮ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। দিনের বেলায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া গেছে। লোডশেডিং-এ ডুবে যায় গ্রাম-গঞ্জ। এ নিত্যকার ঘটনা। বিদ্যুৎ পল্লী বিদ্যুতায়তন বোর্ড আর ইবি অধিক বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা বিদ্যুৎ সংকট বিষয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। পিজিসিবি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সঞ্চালন করে। বিগত সরকারের বকেয়ার দায় ঝুলছে। তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোমাত্রায় সচল নেই। কয়লা না পাওয়ার কারণে পটুয়াখালীর ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ আছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদনের মাত্র ৫০ শতাংশ কমেছে।
এক সমীক্ষা থেকে জানা যায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৯ হাজার মেগাওয়াট। বিগত সরকারের সময়ে নিত্য নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র উদ্বোধন করা হলেও সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। সরকারকে বড়ো ভর্তুকীর মুখে চাপ পোহাতে হচ্ছে। বকেয়ার ভার বহন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিনিয়োগ করা কমে এসেছে (তেলা কেনা যাচ্ছে না- পিডিবিকে রীতিমত জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। আদানীর একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটি কারণে অচল আছে। স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে সময় লাগবে। লোডশেডিং যাচ্ছে না, বরং বাড়ছে। ডিজেল চালিত কেন্দ্রের দিকে এখন মনোযোগ বেড়েছে।
এক হিসেবে জানা যায় সারাদেশে বিদ্যুৎ চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট-বিদুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। ঘাটতির পরিমাণ আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো। অচল কি শুধু গ্রাম-গঞ্জ? ঢাকায় কি থাকছে বিদ্যুৎ প্রবাহ? তা নয় কয়েকটি স্থানে লোডশেডিং হচ্ছে। ভয়াবহ গরমের মধ্যে সাধারন মানুষ ও যন্ত্রের কর্মক্ষমতা কমে এখানে, ঢাকা ইলেকট্রিক সার ও ঢাকা পাওযার (ডিপিডিসি) কোম্পানী (ডেসকো) ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে। বলা যায় ঘাটতি নেই- বিতরণ লাইনের কারিগরি ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটায় স্বাভাবিক বিদুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে।
উত্তরাঞ্চল নর্দার্ন ইলেকট্রিক কোম্পানী (নেসকো) ও দক্ষিণাঞ্চলের ওয়েস্ট জোন ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী পাওয়ার তাদের ঘাটতির কথা স্বীকার এক-দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হতে পারে কিছু অঞ্চলে তাদের অভিমত এই রকম। লোডশেডিং হচ্ছে আর ইবি ৩৫ শতংশ এলাকায়- এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম। ৮টি সমিতি বিদ্যুৎ সরববাহ কাজ করে, তারা বলছে ৪৮ শতাংশ ময়মনসিংহ, রংপুর ৪০ শতাংশ, বিদ্যুৎ ঘাটতি আছে। ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত এই এলাকায় লোডশেডিং হচ্ছে। ঢাকায় বলা যায় স্বাভাবিক, কিন্তু সংকট গ্রামাঞ্চলে। ‘বিদ্যুৎ একটি প্রয়োজনীয় উপাদান- এর উপর ভিত্তি করে কৃষিকাজ পরিচালিত সেচ দেয়া, শ্যালো মেশিন চলে। ডিজেল কিনতে গিয়ে তেলের পাম্প বন্ধ ও ভিড় থাকায় কৃষকের ভোগান্তি বেড়েছে। গ্যাস, কয়লা স্বল্পতা দীর্ঘদিনের।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন কৃষকের সেচকাজ স্বাভাবিক রাখতে রাজধানীতে পরীক্ষামূলক ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করা হবে। তিনি বলেছেন ফসল ওঠার মৌসুমে কৃষকেরা যেন সেচ সুবিধা পায় সরকার সেদিকে নজর দিচ্ছে। ধারাবাহিক অব্যবস্থাপনা বিদ্যুৎ-সংকট সৃষ্টি করছে। উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গ্যাস চাহিদা প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। উৎপাদন হয় ৯৫০ ঘনফুট। ৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট আমদানি করা হয়। ঘাটতি ১ হাজার ঘনফুট। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে। ইরান যুদ্ধের অভিঘাত বিদ্যুৎ খাতেও এসে পড়েছে। পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ চাহিদা দুই-তিন ঘণ্টা বেশি। সেখানে লেডিশেডিং একটা স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখা যায়। সন্ধ্যার দোকানপাট, প্রতিষ্ঠানে কর্ম দিবস কমিয়ে আনা হয়েছে। কম আলো ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎ ঘাটতি ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নির্ভর করে গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেল ওয়েল প্রাপ্তির উপর।
আবহাওয়া বিদুৎ চাহিদা বাড়ায় ও কমায়। ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত সময় ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধক উল্লেখ করছে। বিকল্প প্রস্তাবে সকাল এগারোটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার বিষয় রাখা হয়েছে। মহামারী, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও ইরানে যুদ্ধাবস্থা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অনুঘটক। এখন প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি ও দাতা সংস্থার নতুন উদ্যোগ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে। যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুতের এই আসা-যাওয়া চলতেই থাকবে। কিছু সময় আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক




Comments