Image description

রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, এটাই স্বাভাবিক, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। থাকবে মতবিরোধ, তর্ক-বিতর্ক, যুক্তি, পাল্টা যুক্তি, এসবই একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু এই মতপার্থক্য যদি শালীনতা, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সীমা অতিক্রম করে, তখন তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী না করে বরং দুর্বল করে তোলে। গণতন্ত্রকে করে লজ্জিত, গণতন্ত্রের শালীনতাকে করে বিবস্ত্র। 

একটি পরিণত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতের অমিল থাকলেও রাষ্ট্র ও জনগণের বৃহত্তর কল্যাণে ঐকমত্যে পৌঁছার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা আজকের বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। জাতীয় ঐক্য বা কনসেনসাস হলো সব মত, ভিন্ন পথ, আদর্শ এবং বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের সর্বজনীন স্বার্থে এবং সংকটে দেশপ্রেমের ভিত্তিতে সকলে একত্রিত হয়ে কাজ করা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্য বা কনসেনসাস গড়ে তোলার সংস্কৃতি খুবই বিরল। নব্বই দশকে একবার এই জাতীয় ঐক্য এরশাদ বিরোধী আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও গণঅভ্যুত্থানের অল্প কিছুদিন পরেই তা ভেস্তে যায়।

এর জন্য দায়ী আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতি যা তৈরি করেছে অবিশ্বাসের ‘সংস্কৃতি’, ‘ক্ষমতার সংস্কৃতি’, এমনকি ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। 

ভঙ্গুর রাজনৈতিক সংস্কৃতি যে সকল দেশে দেখা যায় সে সকল দেশে কল্যাণ ও মানবিক রাজনীতি এবং গণতন্ত্র বা জনগণের সরকার জনগণের কাতার থেকে সরে যায়। রাজনীতিবিদ যারা নিজেদেরকে জনগণের সেবক না ভেবে প্রভু ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেন এবং যারা রাজনীতিকে মানবসেবার নীতি থেকে বিচ্যুত করে ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন তারা জনগণের শাসনের নামে  কিংবা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে ক্ষমতায় গিয়ে স্বৈরশাসক হয়ে ওঠেন। জনগণের অধিকার হরণ করেন, রাষ্ট্রকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেন। 

বিগত ৫৫ বছরের রাজনীতির চিত্র তাই বলে। পর্যালোচনা করলে দেশের গণতন্ত্রের করুণ ছবি মানসপটে ভেসে উঠে। গণতন্ত্রের জন্য সাধারণ মানুষের আন্দোলন ত্যাগ সংগ্রাম জীবনদান ও আত্মাহুতি দান, পঙ্গুত্ববরণ, মামলা হামল নির্যাতন-নিপীড়ন নানা প্রকার রাষ্ট্রীয় পীড়ন ভোগের পরেও বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র কখনোই প্রতিস্থাপিত হয়নি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর জাতি এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা করেছিল। মানুষ ভেবেছিল, দীর্ঘদিনের সংঘাতমুখর ও প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতির পরিবর্তে একটি সহনশীল, আলোচনাভিত্তিক ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হবে। যেখানে সরকার তার দায়িত্ব পালন করবে জনগণের কল্যাণে এবং বিরোধী দল গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য রক্ষা করবে।

সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে কিছু ইতিবাচক দৃষ্টান্তও লক্ষ্য করা গেছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ, নিরাপত্তা প্রটোকল হ্রাস করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রচেষ্টা, এসব একটি উদার গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন। জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, তাদের দুঃখ-কষ্ট শোনা এবং ‌‌দ্রুত কিছু সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক সহায়তা, ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান, এসব উদ্যোগ জনগণের মধ্যে কিছুটা আস্থা সৃষ্টি করেছে। তবে এই ইতিবাচকতার পাশাপাশি কিছু উদ্বেগজনক বাস্তবতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকারি দলের কিছু নেতা-কর্মীর আচরণে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে, যা একটি সরকারের সামগ্রিক ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে গেলে এবং তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হলে তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হয়। অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ধরনের অসংযত ও দায়িত্বজ্ঞানহীন প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের একটি মৌলিক অধিকার হলেও, তা যদি মিথ্যাচার, অপপ্রচার এবং বিদ্বেষ ছড়ানোর হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে তা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। বিশেষ করে ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে যে ধরনের প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে, তা রাজনৈতিক সহনশীলতার পরিপন্থী এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য অশুভ সংকেত। 

রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মব কালচার, যা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দিচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর হইতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসের শাসনামলে বাংলাদেশে ৪১৩টি মব সহিংসতার ঘটনায় অন্তত ২৫৯ জন নিহত এবং আহত হন ৩১৩ জন। নতুন সরকারের সময়ে ও মব কালচারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সভ্য সমাজে আইনের শাসন যেখানে সর্বজনীন, সেখানে মব জাস্টিস হলো এক আদিম ও অসভ্য প্রথা, যা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থায় কাম্য হতে পারে না। 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বলতা, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি না হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা যদি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে তা যেকোনো সময় ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকটের জন্ম দিতে পারে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, যে রাজনৈতিক দলগুলো আজ ক্ষমতায় বা বিরোধী অবস্থানে রয়েছে, তারাই একসময় একসঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সেই সময় দল-মত নির্বিশেষে তারা নিপীড়িত জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আজ যদি তারা আবার পারস্পরিক সংঘাতে লিপ্ত হয়, তবে তা জাতির প্রত্যাশার সঙ্গে প্রতারণার শামিল। 

বাংলাদেশের জনগণ আর আগ্রাসী, প্রতিহিংসামূলক ও অসহিষ্ণু রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা চায় একটি সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে আইনের শাসন থাকবে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি কমবে, এবং রাজনৈতিক নেতারা শালীন ও দায়িত্বশীল আচরণ করবেন। অতএব, সময়ের দাবি হলো, রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, মতপার্থক্যকে সংঘাতে নয় বরং সমাধানের পথে ব্যবহার করা, এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে কেবল কথায় নয়, কাজে প্রতিফলিত করা। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার যে সংস্কৃতি, সেটিই হতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় শক্তি। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়, এটি একটি আচরণ, একটি সংস্কৃতি, একটি দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে গণতন্ত্রের কাঠামো টিকে থাকলেও তার আত্মা হারিয়ে যায়। এখন প্রশ্ন, বাংলাদেশ কি সেই আত্মাকে পুনরুদ্ধার করতে পারবে, নাকি মব সংস্কৃতির ভিড়ে তা আরও আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে?

লেখক: অধ্যাপক, কবি ও কলামিস্ট