বাগেরহাটে বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপে বিএনপি, স্বস্তিতে জামায়াত
ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বাগেরহাট জেলা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আবারও রাজনৈতিক উত্তাপে সরগরম। একদিকে বিএনপির একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী দলীয় প্রার্থীদের জন্য তৈরি করেছে জটিল সমীকরণ, অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে সুসংগঠিত অবস্থানে থেকে নির্বাচনী মাঠে এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ফলে বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসনে এবার মূল লড়াইটি রূপ নিচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা ও দায়বদ্ধতার পরীক্ষায়।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, চিংড়ি শিল্প, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ও ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাগেরহাটের সাধারণ মানুষ আজও সুপেয় পানি সংকট, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতায় ভুগছেন। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে এসব সম্ভাবনার সুফল মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয়নি। নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যেই ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের ক্ষোভ ও প্রত্যাশা।
ফকিরহাটের কৃষক মামুন হোসেন বলেন, লবণাক্ততা কৃষিকে ধ্বংস করছে অথচ ভোটের পর জনপ্রতিনিধিদের আর দেখা যায় না।
কচুয়ার বগা ইউনিয়নের জেলে আজাদুল ইসলামের অভিযোগ, দস্যু আতঙ্ক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে জীবন অনিরাপদ হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেই।
বাগেরহাট শহরের বাসিন্দা হানিফ শেখ বলেন, উন্নত চিকিৎসার অভাবে গুরুতর রোগে খুলনা বা ঢাকায় ছুটতে হয়।
এবারের নির্বাচনে বাগেরহাট জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ২১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১৮ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ৩ জন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বাগেরহাট-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম.এ.এইচ সেলিম, যিনি বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ এই তিনটি আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তার এই সিদ্ধান্ত বিএনপির ভোট সমীকরণে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
আসনভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বাগেরহাট ১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মো. মশিউর রহমান খান সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের অঙ্গীকার করেছেন। এই আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন নবাগত নেতা কপিল কৃষ্ণ মণ্ডল। এই আসনে বিএনপি'র বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বহিস্কৃত বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার মাসুদ রানা।
বাগেরহাট-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ মো. জাকির হোসেন উন্নয়ন ও আইনের শাসনের কথা বললেও জামায়াত প্রার্থী শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ নৈতিক নেতৃত্ব ও টেকসই উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন।
বাগেরহাট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী লায়ন ড. ফরিদুল ইসলাম স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পর্যটন খাত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিপরীতে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মাওলানা আব্দুল ওয়াদুদ মংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও মাদক-সন্ত্রাস নির্মূলের অঙ্গীকার করেন।
বাগেরহাট-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম অবহেলিত শরনখোলা-মোড়েলগঞ্জে অবকাঠামো উন্নয়ন ও মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান। বিএনপির প্রার্থী সোমনাথ দে মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে কাজ করার আশ্বাস দেন। এই আসনে বিএনপি'র বিরুদ্ধে প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা খায়রুজ্জামান শিপন।
ভোটারদের মতে, এবারের নির্বাচন আর শুধু উন্নয়নের আশ্বাসে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চান নিয়মিত জনপ্রতিনিধির উপস্থিতি, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দলটি বাড়তি চাপে রয়েছে, আর এই পরিস্থিতিতে জামায়াত তুলনামূলকভাবে স্বস্তিদায়ক অবস্থানে রয়েছে।
উল্লেখ্য, ৭৫টি ইউনিয়ন ও ৩টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত বাগেরহাট জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ১৩,৬১,১১১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬,৮২,৭৩৯ জন, নারী ভোটার ৬,৭৮,৩৫৮ জন এবং হিজড়া ভোটার ১৪ জন। জেলায় মোট ৫৪৭টি ভোটকেন্দ্রে ২,৬৫৯টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।




Comments