Image description

বিএনপি সরকারের উদ্দেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থে জামায়াত কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলবে না। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা বলেন, ‘আপনি (বিএনপি) সংবিধানের এক অংশ মানবেন, আরেক অংশ মানেন না। ভারি মজা।

একটা অর্ডারের ভিত্তিতে দুইটা ভোট একই দিনে হয়েছে। আপনি গোশত মানেন, কিন্তু ঝোল খাইতে রাজি না। একই তরকারি, একই বাসনে পাকানো হয়েছে। গোশতটা খেয়ে নিলেন, বলতেছেন ঝোলটা হারাম।... জনগণকে এত বোকা মনে করার কারণ নাই। জনগণ সব বুঝে। হ্যাঁ, আপনারা মানবেন। তবে সহজে মানবেন না আমরা বুঝতেছি। এ রকম অতীতেও কিছু কিছু বিষয় সহজে মানেননি, কিন্তু পরে ঠিকই মেনেছেন।’

বুধবার বিকেলে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান এ কথা বলেন। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।

শফিকুর রহমান বলেন, পরিবর্তিত বাংলাদেশে শাসক বদলালেও শোষণের ধারা বদলায়নি। তিনি বলেন, ‘সব কষ্ট চেপে আমরা বলেছি, আমাদের দেশটা গণতান্ত্রিক ট্রেন হিসেবে রেললাইনের ওপরে উঠুক, চলুক, সামনের দিকে চলুক। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে। তো উঠাইয়া দিলাম। এই উঠায়ে দেওয়ার পরে এখানে প্রশাসক, ওখানে প্রশাসক। এটা কী? এটা তো সংবিধানবিরোধী। পরিষ্কার।’

বিএনপি সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আপনি সংবিধানের কথা বলতেছেন, ওই সংবিধানেই তো লেখা আছে, স্থানীয় সরকারের সকল স্থলে একমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দায়িত্ব পালন করবেন। এদের কে নির্বাচন করল? এদের দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা এগুলো মানি না।’

গণভোট নিয়ে বিএনপির উদ্দেশে বিরোধী দলীয় নেতা আরও বলেন, ‘এখন একবার ওনারা বলেন যে, আমরা অক্ষরে অক্ষরে মানব। আবার বলেন, জনগণ না বুঝে রায় দিয়ে দিছে। আরে ভাই! জনগণ বুঝুক না বুঝুক, ভোটের অধিকারটা তার, আপনার না। ...আজকেও যদি সেই পুরোনো কায়দায় চিন্তা করা হয় জনগণের ভোটকে অস্বীকার করার, অগ্রাহ্য করার, অপমান করার, তাহলে দেশবাসীকে অপমান করার খেসারত গোনার জন্য তৈরি থাকতে হবে। যেই দেশবাসী রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদ হটানোর রাস্তা চিনে ফেলেছে, এই দেশবাসীকে আর দমানো যাবে না।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদেরকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” এর নামে যে, এই দেশে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকবে না, ন্যায়বিচার কায়েম হবে এবং মানুষ একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সম্মানের সাথে বসবাস করবে। এ লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, পদে পদে লঙ্ঘিত হয়েছে। যার কারণে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।’

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনী জনরায়কে অগ্রাহ্য করে জনমানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বুলেট ও বেয়নেট দিয়ে দমিয়ে রাখতে চেয়েছিল বলে উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী নির্বিচার মানুষ খুন করেছে, মানুষের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে, সম্পদ ধ্বংস করেছে, দেশকে পোড়ামাটির দেশে পরিণত করেছে। কিন্তু নির্যাতন চালিয়েও মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত দেশ স্বাধীন হয়েছে।

স্বাধীন পতাকা ও মানচিত্রের হাত ধরে বাংলাদেশ বদলে যাওয়া উচিত ছিল, তবে সেটি হয়নি বলে উল্লেখ করেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, বোতল পরিবর্তন হলেও ভেতরের জিনিস পরিবর্তন হয়নি। এই পরিবর্তন না হওয়ার কারণ নেতৃত্বের ব্যর্থতা, লোভ, অদূরদর্শিতা ও সীমাহীন দুর্নীতি।

এ বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, শুধু টাকা হাতালে দুর্নীতি হয় না। সবচেয়ে বড় দুর্নীতি হচ্ছে মানুষের অধিকার হরণ করা, অযোগ্য লোকদের যোগ্য জায়গায় বসিয়ে দেওয়া, যোগ্যতাসম্পন্ন লোকদের অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়া। দুর্নীতির এই বিষবাষ্প যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ থেকে বিদায় না নেবে, সমাজ স্বাধীনতার কাঙ্ক্ষিত সুফল ভোগ করতে পারবে না।

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব ও উদ্বোধনী বক্তব্য দেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আবদুস সবুর ফকির। সঞ্চালক ছিলেন ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ। সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

আরও বক্তব্য দেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান, মোবারক হোসাইন, কর্মপরিষদ সদস্য জসীমউদ্দিন সরকার, হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য কামাল হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম প্রমুখ।

এর আগে বেলা তিনটার দিকে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে আলোচনা সভা শুরু হয়। এরপর ‘এই দেশ আমার বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করে মহানগর শিল্পীগোষ্ঠী।