Image description

পবিত্র রমজান মাস হলো ক্ষমা ও বরকতের মাস। এই রমজান মাসেই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছিল, যা মানবজাতির জন্য মহান নির্দেশিকা। রমজানের শবে কদরের রাতে এই পবিত্র কোরআন নাজিল হয়।  তাই এই শবে কদরের রাতের ফজিলত অনেক।  

শবে কদরের ফজিলত:
রমজানের মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ – লাইলাতুল কদর। লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কি জানো কী লাইলাতুল কদর? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।” (সূরা আল-কদর: 1-3).

মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, “কদর রজনী সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সেই রজনীতে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতরণ করেন প্রত্যেক কাজে তাদের রবের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী সুবহে সাদিক উদিত হওয়া পর্যন্ত।” (সূরা কদর, আয়াত : ৩-৫)

এই আয়াতের মর্মস্পর্শী বার্তা আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করে, আমাদের বিশ্বাসকে দৃঢ় করে এবং আমাদের আত্মাকে উন্নত করে। কদর রজনী, যা হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, একটি রহস্যময় ও পবিত্র রাত যা বারবার কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।

"আসরারতু ওয়া মা আ’লানতু। আনতা তা’লামুল গায়বা ওয়াশ শাহাদাতা ফাগফির লি ইন্নাকা আনতা আল ‘আফুওয়ুল গাফুর।"
অর্থ: “হে আমার পালনকর্তা! আমার গুনা, আমার কর্মের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অংশ, আমার গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু ক্ষমা করুন। তুমি গায়ব ও জাহির সবকিছু জানো। সুতরাং আমাকে ক্ষমা করুন। তুমিই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”

رَبِّ اغْفِرْ لِي خَطَايَاىَ وَجَهْلِي وَإِسْرَافِي فِي أَمْرِي وَكُلَّ ذَلِكَ عِنْدَكَ مَكْتُوبٌ
উচ্চারণ: রাব্বিগফির লি খাতায়াইয়া ওয়া জাহলি ওয়া ইসরাফি ফী আমরি ওয়া কুল্লা যালিকা ‘আন্দাকা মাকতুব।
অর্থ: “হে আমার পালনকর্তা! আমার ভুল, আমার অজ্ঞতা, আমার কাজের অতিরিক্ততা এবং এসবের মধ্যে তোমার কাছে লিপিবদ্ধ সবকিছু ক্ষমা করুন।”

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত পবিত্র হাদিস গ্রন্থ সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে , রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সাওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদর তথা (নির্ধারিত মর্যাদার রাত) জেগে ইবাদাত করে, তার বিগত জীবনের সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’ (বুখারি)।

অনেকেরই মাঝে প্রশ্ন থাকে লাইতুল কদর রাত কোন রাত্রি, ভাগ্য রজনীর রাত্রিটি হলো রমজান মাসের শেষ দশের যে কোন বেজোড় রাতই হলো  “লাইলাতুল কদর”। তবে বেশিরভাগ আলেমগণ মতামত দিয়েছেন ২৭ রমজানের রাতটি বেশি সম্ভাব্য বলে অভিহিত করেছেন।

সহীহ্ বুখারীতে শরীফের ১৮৯২ নাম্বার হাদিসে এসেছে:
হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (স:) বলেছেন যে, তোমরা লায়লাতুল কদর রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতে তালাশ কর।

সহীহ্ বুখারী শরীফের আরেকটি হাদিসে এসেছে হযরত আয়েশা (রা:) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স:) রমজানের শেষ দশ দিনে ই’তেকাফে বসতেন এবং বলতেন, তোমরা লাইলাতুল কদর রমজানের শেষ দশ দিনে তালাশ কর।

তিরমিযি শরিফে একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, লাইলাতুল কদরে আমল করার  মতো একটি বিশেষ দোয়ার কথাও বলা হয়েছে হযরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমরা যদি লাইলাতুল কদর পাই তাহলে কি করবো?

উত্তরে রাসুল (সাঃ) বললেন, বলবে  আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া ফাআফুআন্নি।

অর্থাৎ হে আল্লাহ তুমি পরম ক্ষমাশীল, ক্ষমা করাকে তুমি পছন্দ কর, কাজেই তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও’

শবে কদর রাতের প্রস্তুতি:
এই অমূল্য রাতটিকে হেলায় কাটানো উচিত নয়। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) শেষ দশকে ইবাদত বৃদ্ধি করে দিতেন এবং রাত জেগে ইবাদত করতেন।

শবে কদরের নামাজ পড়ার নিয়ম:
শবে কদরের নামাজ দুই রাকআত করে চার রাকআত পড়তে হয়। এরপর যত ইচ্ছা নফল নামাজ পড়া যায়। এই নামাজের প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর একবার সূরা কদর ও তিনবার সূরা ইখ্লাস পড়তে হয়।

সূরা কদর (বাংলায়)
যেহেতু এই সুরাটি নামাজে ব্যবহার করবো তাই সুরাতুল কদরের আরবি, বাংলা উচ্চারণ, বাংলা অর্থ এবং ইংরেজি অর্থ জেনে নেওয়া যাক।

সূরা আল-কদর পবিত্র কুরআন শরীফের ৯৭ তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৫ টি এবং এর রূকুর সংখ্যা ১। আল কদর সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। কদরের এর অর্থ মাহাত্ম্য ও সম্মান। এর মাহাত্ম্য ও সম্মানের কারণে একে “লায়লাতুল-কদর” তথা মহিম্মান্বিত রাত বলা হয়। 

নিচে সূরা আল-কদর এর বাংলা উচ্চারণ সহ দেয়া হলো-

বাংলা উচ্চারণ: ইন্নাআনঝালনা-হু ফী লাইলাতিল কাদর।
বাংলা অর্থ: আমি একে নাযিল করেছি শবে-কদরে।

বাংলা উচ্চারণ: ওয়ামাআদরা-কা-মা-লাইলাতুল কাদর।
বাংলা অর্থ: শবে-কদর সমন্ধে আপনি কি জানেন?

বাংলা উচ্চারণ: লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর।
বাংলা অর্থ: শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।

বাংলা উচ্চারণ: তানাঝঝালুল মালাইকাতুওয়াররুহু ফীহা-বিইযনি রাব্বিহিম মিন কুল্লি আমর।
বাংলা অর্থ: এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে।

বাংলা উচ্চারণ: ছালা-মুন হিয়া হাত্তা-মাতলা‘ইল ফাজর।
বাংলা অর্থ: এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

এই রাতে যে দোয়া বেশি পড়া দরকার:
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, শবে কদরের রাতে আমার কোন দোয়াটি পড়া উচিত?’ তিনি তাঁকে পড়ার জন্য নির্দেশ দিলেন-

বাংলা উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’

বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল; ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

শবে-কদরের নামাজের নিয়ত:
নাওয়াইতু আন্‌ উছাল্লিয়া লিল্লাহি তা’য়ালা রাকআতাই সালাতিল লাইলাতিল কাদ্‌রি নফ্‌লে মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারীফাতি- আল্লাহু আকবর।

বাংলা অর্থ: আমি কাবামুখী হয়ে আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্য শবে কদরের দুই রাকআত নফল নামাজ পড়ার নিয়ত করলাম- আল্লাহু আকবর।

শবে কদরের দোয়া:
মর্যাদার রাত লাইলাতুল কদর। যে রাতটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতে নবীজি (স.) বিশেষ দোয়া পড়তে বলেছেন।
দোয়াটি হলো;

আরবী উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন কারিমুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’
বাংলা অর্থ : ‘হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করতে পছন্দ করেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কাছে জানতে চেয়েছেন, ‘কোন রাতটি লাইলাতুল কদর, তা যদি আমি জানতে পারি, তখন কোন দোয়া পড়বো?’ তখন রাসুলুল্লাহ (স.) তাঁকে উপরোক্ত দোয়াটি পড়তে বলেন। (তিরমিজি: ৩৫১৩)

মোনাজাত:
মুনাজাতের মাধ্যমে বান্দার বন্দেগি ও আল্লাহর রবুবিয়াতের প্রকাশ ঘটে। বান্দাহ তার প্রভূর কাছে চায়। প্রভূ এতে ভীষণ খুশি হন। মহন আল্লাহ তার বান্দার প্রতি এতটাই অনুগ্রহশীল যে, তিনি তার কাছে না চাইলে অসস্তুষ্ট হন। ‘যে আল্লাহর নিকট কিছু চায় না আল্লাহ তার উপর রাগ করেন’- (তিরমিযি)। ‘দোয়া ইবাদতের মূল”- (আল হাদিস)।’ যার জন্য দোয়ার দরজা খোলা তার জন্য রহমতের দরজাই খোলা রয়েছে’- (তিরমিযি)। কাজেই আমরা কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করব, ক্ষমা চাইব, রহমত চাইব, জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইব।

উপরোক্ত আমলের মাধ্যমে আমরা এ পবিত্র রাতটি কাটাতে পারি। লাইলাতুল কদর পাওয়ার তামান্না নিয়ে নিষ্ঠার সাথে অনুসন্ধান করলে আল্লাহ আমাদের বঞ্চিত করবেন না ইনশাআল্লাহ।

তাই আসুন আমরা সকলেই লাইলাতুল কদরের রাতের জন্য প্রস্তুত হই এবং আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত রহমত, ক্ষমা ও মুক্তির বরকত লাভ করি।