Image description

দেশে চলমান হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ প্রস্তাব করেছেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা। শুক্রবার (১৫ মে) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক বিস্তারিত পোস্টে তিনি এই সংকট উত্তরণে বৈজ্ঞানিক ও প্রশাসনিক কৌশলগুলো তুলে ধরেন।

ডা. তাসনিম জারা তার পোস্টে উল্লেখ করেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে, যা কোভিড বা ফ্লু-এর চেয়েও বেশি। হামের ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি চলে যাওয়ার ২ ঘণ্টা পরেও সেখানে নতুন কেউ এলে সংক্রমিত হতে পারেন। এই কারণেই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ নিশ্চিত করতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের টিকা নেওয়া জরুরি।

জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ বেশি হওয়া সত্ত্বেও কেন আউটব্রেক হচ্ছে—তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, জাতীয় গড় হার ৯৫ শতাংশ হলেও চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা বা বস্তির মতো নির্দিষ্ট কিছু ‘পকেটে’ কভারেজ হয়তো ৬০-৭০ শতাংশ। ভাইরাসের কাছে এই ফাঁকা পকেটগুলো ঢাকা পড়ে না, ফলে সেখান থেকেই দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে।

প্রস্তাবিত রোডম্যাপের মূল পয়েন্টগুলো:

১. জাতীয় হাম হটলাইন ও কল সেন্টার: তৃণমূল পর্যায়ে কেস শনাক্ত করতে একটি জাতীয় কল সেন্টার চালুর প্রস্তাব করেছেন তিনি। টেলিমেডিসিন অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের মাধ্যমে লক্ষণ যাচাই করে রোগীদের নির্দিষ্ট কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হবে।

২. রিয়েল-টাইম জিও-ম্যাপিং ড্যাশবোর্ড: কল সেন্টারের তথ্য ব্যবহার করে একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড তৈরির কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে রিয়েল-টাইমে দেখা যাবে কোন পাড়ায় বা মহল্লায় কেস বাড়ছে, যাতে সরকার দ্রুত সেখানে টিকা টিম পাঠাতে পারে।

৩. রিং ভ্যাকসিনেশন কৌশল: কোনো এলাকায় রোগী পাওয়া গেলে তাকে কেন্দ্রে রেখে চারপাশে কয়েক স্তরে (পরিবার, প্রতিবেশী, স্কুল-মাদ্রাসা) দ্রুত টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এটি সংক্রমণের চারপাশে একটি প্রতিরোধক বলয় তৈরি করবে।

৪. নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্র ও আইসোলেশন: এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী দৌড়াদৌড়ি বন্ধ করতে প্রতি এলাকায় নির্দিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্র চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি। এর ফলে সাধারণ হাসপাতালে থাকা শিশু বা ক্যান্সার রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমবে।

৫. বেড-অ্যাভেইলেবিলিটি ড্যাশবোর্ড: কোন হাসপাতালে কয়টি বেড বা আইসিইউ খালি আছে, তার রিয়েল-টাইম তথ্য অভিভাবকদের জানাতে একটি ড্যাশবোর্ড প্রয়োজন। এতে দালালের হয়রানি ও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে।

৬. পিডিয়াট্রিক আইসিইউ ও পিপিপি: আইসিইউ সংকট মেটাতে বেসরকারি হাসপাতালের সাথে ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ (PPP) স্থাপনের মাধ্যমে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

৭. চিকিৎসা ব্যয় ও থোক বরাদ্দ: দেশে স্বাস্থ্যখাতে উচ্চ ব্যক্তিগত ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে ডা. জারা বলেন, হামের ওষুধসহ সব চিকিৎসা খরচ সরকারের বহন করা উচিত। এছাড়া ভর্তি রোগীদের জন্য এককালীন থোক বরাদ্দের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

৮. সংসদীয় তদন্ত কমিটি: এই সংকট কেন তৈরি হলো এবং গাফিলতি কোথায় ছিল, তা খতিয়ে দেখতে একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ডা. তাসনিম জারা তার বার্তায় জোর দিয়ে বলেন, হাম মোকাবিলায় বিশ্বে প্রমাণিত পদ্ধতিগুলো আমাদের জানাই আছে। এখন যা প্রয়োজন তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শক্তিশালী প্রশাসনিক সমন্বয়।

মানবকণ্ঠ/ডিআর