Image description

পাকিস্তানের একটি হাসপাতালে সিরিঞ্জ পুনঃব্যবহারের ফলে ৩৩১ জন শিশু এইচআইভি-তে আক্রান্ত হয়েছে। বিবিসি নিউজের ৩২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে গোপনে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, কর্মীরা মাল্টি-ডোজ ভায়ালে সিরিঞ্জ পুনরায় ব্যবহার করছেন এবং জীবাণুমুক্ত গ্লাভস ছাড়াই রোগীদের ইনজেকশন দিচ্ছেন। _এনডিটিভি

বিবিসি নিউজের এক গোপন অনুসন্ধানে পাকিস্তানের তৌনসার টিএইচকিউ হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুতর পদ্ধতিগত ব্যর্থতার চিত্র উঠে এসেছে। তদন্তে দেখা গেছে, হাসপাতালের কিছু কর্মী শিশুদের চিকিৎসায় একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহার করছেন। গোপন ধারণ করা ফুটেজে বিপজ্জনক স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন এবং একাধিক রোগীর জন্য চিকিৎসা সরঞ্জাম পুনঃব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিরাপদ চিকিৎসা পদ্ধতি এইচআইভি প্রাদুর্ভাবসহ বিভিন্ন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এই সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আট বছর বয়সী মোহাম্মদ আমিনের হৃদয়বিদারক গল্প। এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সে মারা যায়। তার মা জানান, জীবনের শেষ দিনগুলোতে আমিন তীব্র জ্বর ও অসহনীয় ব্যথায় চরম কষ্ট সহ্য করেছিল।

আমিনের মৃত্যুর কিছুদিন পরই তার বোন আসমার শরীরেও এইচআইভি ধরা পড়ে। পরিবারের দাবি, একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসার সময় দেওয়া দূষিত ইনজেকশনের মাধ্যমেই দুই শিশুই এই প্রাণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল।

২০২৪ সালের শেষের দিকে এই প্রাদুর্ভাবটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে, যখন স্থানীয় চিকিৎসক ডা. গুল কায়সরানি তাঁর ক্লিনিকে আসা শিশুদের মধ্যে এইচআইভি আক্রান্তের সংখ্যায় অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করেন।

৩৩১ জন শিশু এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে:
বিবিসির অনুসন্ধানে টাউনসায় নভেম্বর ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৫-এর মধ্যে এইচআইভি পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হওয়া অন্তত ৩৩১ জন শিশুকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, এই সংক্রমণগুলোর অনেকগুলোই অনিরাপদ ইনজেকশন পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

২০২৫ সালের শেষের দিকে টিএইচকিউ টাউনসা হাসপাতালের ভেতরে ৩২ ঘণ্টা ধরে বিবিসির গোপনে ধারণ করা ফুটেজে মৌলিক স্বাস্থ্যবিধির একাধিক লঙ্ঘন ধরা পড়েছে। কর্মীদের একাধিক ডোজের ওষুধের শিশিতে সিরিঞ্জ পুনরায় ব্যবহার করতে দেখা গেছে, যা ওষুধের পুরো ব্যাচকে দূষিত করার ঝুঁকি তৈরি করে। বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে, একই শিশি পরে ভিন্ন ভিন্ন শিশুর চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়েছিল।

অণুজীববিজ্ঞানী এবং পাকিস্তানের অন্যতম শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. আলতাফ আহমেদ বলেছেন, "নতুন সুচ লাগানো হলেও, সিরিঞ্জের পেছনের অংশে, যাকে আমরা বডি বলি, তাতে ভাইরাস থেকে যায়, তাই নতুন সুচের মাধ্যমেও ভাইরাস ছড়াবে"। 

ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নার্স অবশিষ্ট তরলসহ একটি ব্যবহৃত সিরিঞ্জ তুলে নিয়ে দৃশ্যত পুনরায় ব্যবহারের জন্য এক সহকর্মীর হাতে তুলে দিচ্ছে। 

এ বিষয়ে ড. আলতাফ আহমেদ বলেন, “তিনি ওষুধ প্রয়োগের প্রতিটি নীতি লঙ্ঘন করছেন।”

ভিডিওটির অন্যান্য দৃশ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের চিত্র ফুটে উঠেছে, যার মধ্যে রয়েছে খোলা শিশি, কাউন্টারটপের ওপর ফেলে রাখা ব্যবহৃত সূঁচ এবং চিকিৎসা বর্জ্যের অনুপযুক্ত নিষ্কাশন। অভিভাবকরাও একাধিক রোগীর ক্ষেত্রে সিরিঞ্জের পুনঃব্যবহারের মতো অনিরাপদ কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করার কথা জানিয়েছেন।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে এই ধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে সহজেই সংক্রমণ ছড়াতে পারে। ফুটেজে আরও দেখা গেছে, হাসপাতালের কর্মীরা কয়েক ডজন বার জীবাণুমুক্ত গ্লাভস ছাড়াই ইনজেকশন দিচ্ছেন, যা ক্রস-কন্টামিনেশনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অস্বীকার করছে হাসপাতাল:
এই প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো অন্যায় করার কথা অস্বীকার করেছে। হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডক্টর কাসিম বুজদার ফুটেজটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ধারণা করেছেন যে এটি সাজানো হতে পারে অথবা তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের আগে রেকর্ড করা হয়ে থাকতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে হাসপাতালটি রোগীদের জন্য নিরাপদ এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।