Image description

একটা সময় ছিল, যখন সূর্য অস্তমিত হওয়ার পরই অন্ধকারে তলিয়ে যেত গ্রাম, গঞ্জ, শহর। কুপি কিংবা হারিকেন বাতির আলোই ছিল সে সময়ের মানুষের ভরসা। এখন যুগ পাল্টেছে। ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। আঁধার সরিয়ে জ্বলমলে হয়ে গেছে রাত। শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি গৃহস্থালি কাজেও অপরিহার্য হয়ে ওঠা এই বিদ্যুৎ শুরু করে দিয়েছে ভেলকিবাজি। এই আসে, এই যায়। গ্রামগুলোতে লোডশেডিং চলে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও দুই-তিনদিনেও দেখা মিলছে না বিদ্যুতের। 

এদিকে রাজধানীসহ জেলা ও উপজেলা শহরগুলোতেও এখন আর স্বস্তি নেই। প্রতিদিনই অন্তত ৩ থেকে ৪ বার লোডশেডিং হচ্ছে। এমন অবস্থার মধ্যে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আদানির দুই ইউনিটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তীব্র গরম আর জ্বালানি সংকটের মধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিং অসহনীয় পর্যায়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। 

অবশ্য গতকাল বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী রাজধানীতে লোডশেডিং আরও বাড়বে বলে ঘোষণা দেয়ার পরই সব মহলে শঙ্কা বেড়েছে। এমনিতেই বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিসর কমেছে। এরমধ্যে বিদ্যুৎ নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে এই অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, তেল সংকটের কারণে উৎপাদনে রেশনিং করা হচ্ছে এবং মোট সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে, যা শিগগিরই ২০ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে লোডশেডিং আরো বাড়বে এতে সন্দেহ নেই।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ ও খুলনার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রেখে ঘাটতি কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম গতকাল বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেশি বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়া। প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই ইউনিটটি কারিগরি সমস্যার কারণে বন্ধ রয়েছে এবং এটি পুনরায় চালু হতে আরো তিন থেকে চার দিন লাগতে পারে। এতে করে বিদ্যুৎ সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি বেড়েছে। একই সঙ্গে চলমান তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিকল্প হিসেবে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ ও খুলনার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু রেখে ঘাটতি কিছুটা পূরণ করার চেষ্টা চলছে।

জানা গেছে, আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ কোম্পানির দুটি ইউনিটের একটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। সেই ইউনিটটি গত ১১ এপ্রিল চালু হয়। তবে ১১ দিনের মাথায় এসে বুধবার দুপুরে ফের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে করে লোডশেডিং আরও বাড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) এর তথ্য মতে, এদিন দুই ইউনিট থেকে সর্বোচ্চ ১৫০০ মেগাওয়াট (১৪৯৯) করে বিদ্যুৎ দিচ্ছিল আদানি। দুপুর ২টায় তা এক লাফে সাড়ে ৭০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে। বুধবার দিনের বেলা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। বিদ্যুতের বিশাল এই ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে বেশি লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন জেলার গ্রামগুলোতে এখন দিনে-রাতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে ভারতীয় কোম্পানি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোডশেডিং আরো বেড়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে এই দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং জনজীবনে অসহনীয় দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন। রাতেও বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে, ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভেঙে পড়ছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীদেরও পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, জ্বালানি আমদানিতে জটিলতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া বিল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র সক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও জ্বালানির অভাবে পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারছে না।

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য বলছে, বুধবার দুপুর ১২টার সময় (ডে পিক) দেশে ১৫ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৪০ মেগাওয়াট। বিকাল ৪টায় ১৫ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৫৬ মেগাওয়াট। তখন চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি ছিল প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট, যা চলতি বছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ লোডশেডিং। পিজিসিবির তথ্য বলছে, গত বছরের এই দিনে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ লোডশেডিং ছিল ১৫৭ মেগাওয়াট। তবে গত বছরের এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৩৫৩ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট থাকলেও বাস্তবে জ্বালানি সংকটের কারণে এর অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেও। বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে প্রথমেই গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ কমানো হচ্ছে, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমানে সেই প্রবণতা আরো স্পষ্ট। পরিকল্পিতভাবে শহরকে লোডশেডিংমুক্ত রাখার চেষ্টা করা হলেও গ্রামগুলোতে দিন-রাত মিলিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে গ্রামীণ জীবনযাত্রা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। গ্রামাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিংয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। গ্রামাঞ্চলের অনেক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেক উদ্যোক্তা বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন, এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটের বড় আঘাত এসেছে কৃষি খাতেও। বিদ্যুত্চালিত সেচব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বোরো ধানের চাষ হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক এলাকায় পানির অভাবে জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা সময়মতো সেচ দিতে না পারায় ফলন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মাছের হ্যাচারিগুলোতেও উৎপাদন কমে গেছে। 

বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক সংকটও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া ৪৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত ৭-৮ মাস ধরে বিল পরিশোধ না হওয়ায় এসব কেন্দ্রের উদ্যোক্তারা চরম সংকটে পড়েছেন। দীর্ঘদিন বিল পরিশোধ না হওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকরা জ্বালানি আমদানি করতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। 

এ বিষয়ে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেভিড হাসানাত গণমাধ্যমকে বলেছেন, জ্বালানি তেল সংকটের কারণে আমরা পুরো সক্ষমতায় বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে পারছি না। সরকারের কাছে আমাদের গড়ে আট মাসের বকেয়া আটকে আছে। বিপুল পরিমাণ বকেয়ার টাকা আটকে থাকায় আমরা জ্বালানি তেল আমদানি করতে পারছি না।

পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও কমেছে: রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে পানি স্বল্পতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরো হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মধ্যে শুধু একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। আর এই একটি ইউনিট থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এই কেন্দ্রে পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ২৪২ মেগাওয়াট। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেছেন, শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর দিন দিন কমতে থাকে। আর পানির ওপর নির্ভরশীল এই কেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মধ্যে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত শুধু ২ নম্বর ইউনিট থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে রুলকার্ভ অনুযায়ী কাপ্তাই হ্রদে ৮৩.৮০ এমএসএল (মিনস সি লেভেল) পানি থাকার কথা থাকলেও বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে পানির লেভেল ছিল ৭৭.৪৭ এমএসএল।