জনসেবার আড়ালে স্বদেশ প্রোপার্টিজের দখলদারি!
৩ হাজার প্রাণের আর্তনাদ ও রাজউকে গণঅভিযোগ
রাজধানীর উত্তরখান ও খিলক্ষেত থানাধীন বাওথার মৌজায় জনসেবার দোহাই দিয়ে সরকারি ‘বোয়ালিয়া খাল’ দখল করে বেইলি ব্রিজ নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে বিতর্কিত আবাসন কোম্পানি ‘স্বদেশ প্রপার্টিজ’-এর বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এই ব্রিজের উদ্দেশ্য জনসেবা নয়, বরং সাধারণ মানুষের পৈতৃক ভিটা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি জবরদখল করা। এই অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গত রোবাবার (২৬ এপ্রিল) রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও পরিবেশ অধিদপ্তরে প্রায় ৩ হাজার বাসিন্দার গণস্বাক্ষরসহ লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বদেশ প্রপার্টিজের প্রকৃত নিয়ন্ত্রক মূলত আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াকিল উদ্দিন এবং তার ছেলেরা। গত ১৭ বছরে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জমি দখল ও পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর অসংখ্য মামলা মাথায় নিয়ে ওয়াকিল উদ্দিন দেশ ছেড়ে পালালেও তার ‘লুটপাটের সাম্রাজ্য’ নিরাপদ রাখতে এক অভিনব দাবার ঘুঁটি চালা হয়েছে। গত অক্টোবর মাসে এম এ কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তিকে মাত্র ১০ শতাংশ শেয়ার দিয়ে তড়িঘড়ি করে এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) পদে বসানো হয়। স্থানীয়দের দাবি, কাইয়ুমের গায়ে বিএনপির তকমা থাকায় তাকে ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি কাইয়ুম ১৭ বছর ধরে এমডি পদে আছেন বলে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। জয়েন্ট স্টকের নথিপত্র বলছে, মালিকানার মূল চাবিকাঠি এখনো সেই পলাতক ওয়াকিল উদ্দিন ও তার ছেলেদের হাতেই। মূলত আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পুনর্বাসন ও নিরাপদ অর্থায়নের জন্যই্ বিএনপির নাম ভাঙানো হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাওথার মৌজার মহানগর দাগ ২৪২৮ ও আরএস ৭১১ দাগভুক্ত সরকারি বোয়ালিয়া খালের বুক চিরে বিশালাকার সব কংক্রিটের পিলার বসানো হয়েছে। এতে খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এটি সরাসরি ‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’ এবং ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)’-এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। আইনের ৮ ও ১২ ধারা অনুযায়ী, জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন বা ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ, যার শাস্তি হিসেবে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এদিকে রাজধানীর ফুসফুস খ্যাত জলাশয় রক্ষায় যখন পরিবেশ অধিদপ্তর হিমশিম খাচ্ছে, তখন স্বদেশ প্রপার্টিজের আবদার মেটাতে ব্যস্ত রাজউক। একদিকে চলছে জলাশয় ভরাটের তদন্ত, অন্যদিকে সেই খালের ওপরই ব্রিজ বানানোর ‘রাজকীয়’ অনুমতি—এমনই এক বৈপরীত্যের চিত্র ফুটে উঠেছে বাওথার, বরুয়া ও ডুমনী মৌজায়। গত ৫ই জানুয়ারি ২০২৫ সালে জলাশয় ভরাটের অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তরের গঠিত শুনানিতে স্বদেশ প্রপার্টিজের দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য রাজউককে অনুরোধ জানানো হয়। রাজউকের উপ-নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সাইফুল ইসলাম গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ এক চিঠিতে স্বীকার করেন—বরুয়া ও ডুমনী মৌজার বিতর্কিত দাগগুলোতে স্বদেশ প্রপার্টিজ কর্তৃক অবৈধ ভরাট কাজ এখনো চলমান রয়েছে। জমির রেকর্ড যাচাইয়ের জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর চিঠি পাঠানো হলেও তার জবাব এখনো আসেনি। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরকে মতামত দিতে রাজউক মাসের পর মাস সময় নিলেও স্বদেশ প্রপার্টিজকে সুবিধা দিতে মোটেও দেরি করেনি। কোনো প্রকার চূড়ান্ত জরিপ বা এসি ল্যান্ডের প্রতিবেদন ছাড়াই ৩০ জনু ২০২৫ তারিখে সরকারি খালের ওপর এই বিতর্কিত বেইলি ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে রাজউক। প্রশ্ন উঠেছে, যে খালের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন এবং যেখানে অবৈধ ভরাট চলছে বলে রাজউক নিজেই প্রতিবেদন দিচ্ছে, সেই খালের ওপর ব্রিজ নির্মাণের অনুমোদন তারা কোন খুঁটির জোরে দিল?
এদিকে বোয়ালিয়া খালের দিকে তাকালে এখন আর বোঝার উপায় নেই যে, এখানে একসময় পানির অবিরাম ধারা বইত। যেখানে বেইলি ব্রিজটি নির্মাণ করা হচ্ছে, ঠিক তার পর থেকেই খালের অস্তিত্ব যেন স্রেফ গিলে ফেলা হয়েছে। বিশাল এলাকাজুড়ে বালু ফেলে এমনভাবে ভরাট করা হয়েছে যে, খালের মানচিত্রটিই এখন বিলীন হওয়ার পথে। নির্মাণাধীন ব্রিজের ওপারে প্রবহমান খালটি এখন ধু-ধু বালুর মরুভূমি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, স্বদেশ প্রোপার্টিজ রাজউক ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে খালের প্রকৃত প্রশস্ততা ও মালিকানা সংক্রান্ত ভুল তথ্য দিয়ে প্রতারণা করেছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী, যেকোনো বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের আগে ‘পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ’ (EIA) বাধ্যতামূলক। কিন্তু কোম্পানিটি কোনো ইআইএ ছাড়াই নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, বোয়ালিয়া খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রবাহ বন্ধ হলে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (DAP) মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে। সামান্য বৃষ্টিতেই বাওথার ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে এবং এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে।
এলাকাবাসী ব্রিজ নির্মাণকাজকে ‘সাঁতারকুল মডেলের’ পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, স্বদেশ প্রোপার্টিজ এর আগে বাড্ডা থানার সাঁতারকুল এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষের জমি অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল। এখন একই ছক বাওথার মৌজায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই ব্রিজটি নির্মিত হলে কোম্পানিটি নির্বিঘ্নে সাধারণ মানুষের জমিতে প্রবেশ করবে এবং নিরীহ মালিকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে সস্তায় জমি লিখে দিতে বাধ্য করবে। ইতিমধ্যেই অনেক জমিমালিক তাদের নিজস্ব জমিতে যেতে বাধা পাচ্ছেন এবং প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজউক কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সরকারি খালের ওপর ব্রিজ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর শর্তারোপ করতে বাধ্য। ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালা-২০০৮ অনুযায়ী, রাস্তার প্রশস্ততা এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো নকশা অনুমোদনযোগ্য নয়। যদি ভুল তথ্য দিয়ে অনুমোদন নেওয়া হয়, তবে নগর উন্নয়ন আইন-১৯৫৩ অনুযায়ী রাজউক যেকোনো সময় সেই অনুমোদন বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “ব্রীজটি মূলত আমাদের পৈতৃক ভিটা থেকে উচ্ছেদ করার একটি হাতিয়ার। তারা রাজউককে বুঝিয়েছে এটা জনস্বার্থে, কিন্তু আসলে এটা তাদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যের জন্য খালের ওপর অবৈধ থাবা।”
স্থানীয়দের জমা দেওয়া আবেদনে তিনটি দাবি উত্থাপন করা হয়েছে— ১. অবিলম্বে বেইলি ব্রিজের নির্মাণ কাজ বন্ধে ‘স্টে অর্ডার’ জারি করা। ২. খালের মূল সীমানা নির্ধারণ করে তা পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। ৩. রাজউককে ভুল তথ্য দিয়ে নেওয়া ব্রিজের অনুমোদন বাতিল করা।
এ বিষয়ে রাজউক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এলাকাবাসীর অভিযোগটি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। একটি কারিগরি কমিটি (Technical Team) দিয়ে সরেজমিন তদন্ত পরিচালনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়, তবে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




Comments