Image description

নির্বাচনী রোডম্যাপ তৈরি করছে বিএনপি। প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনী প্রচারেও নামবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত কর্মসূচি বা রোডম্যাপ চূড়ান্ত করা হচ্ছে। বিভাগীয় পর্যায়ে জনসভার পাশাপাশি ঢাকার কয়েকটি আসনেও ধানের শীষের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে নামবেন তিনি। এর বাইরে ঢাকা-১২সহ জোট শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয়া আসনগুলোতেও যেতে পারেন তারেক রহমান। 

তফশিল অনুযায়ী, আগামী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে। এদিকে প্রয়াত মায়ের মতো সিলেটে দুই সুফি সাধকের মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান।

বিএনপির মনোযোগের কেন্দ্রে এখন ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে নির্বাচন পরিচালনায় ৪১ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে এবং শোকের আবহের মধ্যেও তারা পুরোপুরি নির্বাচনমুখি হতে চান। দলীয় প্রধানের মৃত্যুতে দল ঘোষিত মাত্র সাত দিনের শোকের কর্মসূচি ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে।  এবার পূর্ণোদ্যমে ভোটের মাঠে সক্রিয় হবেন ধানের শীষের প্রার্থী ও নেতাকর্মীরা।

 এছাড়া দাখিলকৃত মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দিকে কেন্দ্রীয়ভাবে দৃষ্টি রাখছে বিএনপি। পাশাপাশি দল মনোনীত প্রার্থী ও মিত্রদের জন্য ছেড়ে দেয়া আসনগুলোর যেখানে দলের ‘স্বতন্ত্র’ বা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী রয়েছে সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রতীক বরাদ্দ এবং নির্বাচনের মাঠে পুরোপুরি নামার আগে এ বিষয়গুলোতে জোর দিচ্ছেন বিএনপির হাইকমান্ড। একই সঙ্গে প্রচার-প্রচারণার কৌশল নির্ধারণ এবং দলীয় ইশতেহার চূড়ান্তকরণের কাজও এগিয়ে রাখছে বিএনপি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব জানা গেছে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা, তা বিএনপিকে আরও শক্তিশালী করবে। দেশের এই ক্রান্তিকালে যখন তার অভিভাবকত্ব সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, সে সময় তার চলে যাওয়ায় দেশবাসী গভীরভাবে মর্মাহত। এ কারণে জানাজায় সবাই সমবেত হয়েছেন, অশ্রু ফেলেছেন। তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার জন্য কর্তব্য পালন করবেন, এ প্রত্যয় নিয়ে গেছেন দেশের মানুষ। আগামীতে তারেক রহমানের নেতৃত্বই স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সুসংহত করবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে দেশের পক্ষের যে শক্তি রয়েছে, তা বিএনপিকে বিজয়ী করবে। 

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আমরা দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চাই। দেশনেত্রীর মৃত্যুতে দলীয় শোক মাত্র শেষ হয়েছে। এবার সাংগঠনিক কাজে আবারও পূর্ণোদ্যমে মনোনিবেশ করব। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে আমরা জাতি বিনির্মাণে ব্যবহার করতে চাই। 

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি কমিটি হয়েছে। আশা করছি, খুব শিগগির আমরা বসে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে করণীয় ঠিক করবো। 

বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, তারেক রহমানের নতুন ভাবনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতীয় ঐক্য। তিনি বারবার ব্যক্ত করছেন যে, বিভাজনের রাজনীতি বাংলাদেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তাই সব মত ও পথের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনই তার মূল লক্ষ্য। মায়ের অভাব পূরণ হওয়ার নয়, কিন্তু দেশের মানুষের ভালোবাসা এবং তাদের স্বপ্ন পূরণের দায়িত্বই এখন তার জীবনের প্রধান ব্রত। তার লক্ষ্য এমন এক বাংলাদেশ গড়া যেখানে বিচারহীনতা নয়, বরং ন্যায়বিচার হবে শেষ কথা। 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু বলেন, বর্তমানে তারেক রহমানের কাছে দল এবং দেশ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক দলই পারে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র উপহার দিতে। নিশ্চয়ই তারেক রহমান দলকে এমনভাবে গড়ে তুলবেন যাতে তৃণমূলের ভূমিকা প্রাধান্য পাবে। যেটি তিনি দেড়যুগ আগে শুরু করেছিলেন। একই সঙ্গে চব্বিশের ঐতিহাসিক বিপ্লবে তরুণদের যে ভূমিকা ছিল, তার প্রতি সম্মান জানিয়ে আগামীর নেতৃত্বে মেধাবী ও সৎ তরুণদের অগ্রাধিকার দিয়ে দেশ পরিচালনায় নজির তৈরি করবেন তারেক রহমান। 

এদিকে দেশে ফিরেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় পর গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফেরার পাঁচ দিনের মাথায় মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন। তবে দেশ ও জাতির স্বার্থে সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। নিয়মিত রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অফিস করছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। এসব বৈঠকে রাজনীতির পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী দেশ গঠন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে মুক্তির উপায়সহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন তারেক রহমান। সময় পেলে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করছেন। 

ঢাকায় এই ব্যস্ততার ফাঁকে দীর্ঘ ১৯ বছর পর আগামী ১১ জানুয়ারি পৈতৃক জেলা বগুড়া সফরে যাবেন তিনি। দুদিনের সফরে বগুড়া জেলা বিএনপি আয়োজিত সদ্যপ্রয়াত দলীয় চেয়ারপারসনের রুহের মাগফিরাত কামনায় গণদোয়া মাহফিলে অংশ নেবেন। এ ছাড়া রংপুরে জুলাই আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন। আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনের পাশাপাশি বগুড়া-৬ (সদর) আসনেও বিএনপির প্রার্থী তারেক রহমান।

জানা গেছে, রাজনীতিবিদদের মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে বিএনপির সমর্থনে নিজ দলের প্রতীকে ভোট করা দলগুলোর নেতারাই মূলত তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। বিজয় নিশ্চিতে তাদের জন্য বিএনপির ছেড়ে দেয়া আসনে কোনো ব্যানারেই যাতে দলের নেতারা নির্বাচনের মাঠে না থাকেন, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন তারা। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তারেক রহমানকে সান্ত্বনা ও সমবেদনা জানাচ্ছেন জোট নেতারা। 

মনোনয়ন না পেয়ে অর্ধশতাধিক আসনে ‘অভিমানী নেতারা’ স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনের মাঠে আবির্ভূত হয়েছেন। বিদ্রোহী হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এসব পদলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধানের শীষ এবং জোট প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিতে বিদ্রোহী প্রর্থীরা যাতে নির্বাচন থেকে সরে যান, সেজন্য দ্রুততম সময়ে তাদের সঙ্গে বসতে পারেন তারেক রহমান। 

এদিকে, গত কয়েকদিনের সাক্ষাতের ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবারও গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তারেক রহমান। সকালে বাম দলগুলোর জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে একাত্তরকে বাদ দিলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

তারেক রহমান বলেন, ‘অবিশ্বাসী বা সংশয়বাদীসহ সবাইকে নিয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা তার আছে।