আমি কি এজন্য হাত হারালাম? মৃত্যুর মুখ থেকে ফেরা জুলাই যোদ্ধা জাহিদের আকুতি
রক্তে ভেজা শরীর নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন সরকারি বরিশাল কলেজের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম। বুক আর হাতে গুলিবিদ্ধ জাহিদের অ্যাম্বুলেন্সটি রামপুরা গোলচত্বরে আসতেই থামিয়ে দেয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা। ভেতরে উঁকি দিয়ে একজন চিনে ফেলে চিৎকার করে ওঠেন, ‘ও তো সকাল থেকে অনেক করছে... ওরে গুলি করে দে।’ ভাগ্য সহায় ছিল বলে সে যাত্রা বেঁচে ফিরলেও, জাহিদ হারিয়েছেন তার ডান হাতটি। আজ দুই বছরেরও বেশি সময় পার হলেও সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত তাড়া করে বেড়ায় তাকে। রাষ্ট্র ও ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় এখন তার মনে প্রশ্ন— ‘এই ত্যাগের মূল্য রাষ্ট্র কতটা দিতে পেরেছে?’
সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ঢাকা মেইলের কাছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর রোমহর্ষক স্মৃতিচারণ করেন জুলাই যোদ্ধা জাহিদুল ইসলাম। অন্য গণমাধ্যমের জন্য তার সেই লড়াই ও বর্তমান পরিস্থিতির বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
যেভাবে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া
১৯ জুলাই ছুটির দিনে সকালে রামপুরা গোলচত্বরে গিয়েছিলেন জাহিদ। পরিস্থিতি তখনো শান্ত ছিল। কিন্তু বনশ্রী রোডে আন্দোলনকারীরা যখন শুধু কলাগাছ ফেলে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করছিল, তখনই কোনো উসকানি ছাড়াই বিজিবি গুলি চালায়। জাহিদ বলেন:
"হঠাৎ তারা গুলি করল। আমার পায়ের মাঝখান দিয়ে গুলি চলে গিয়ে পিছনের এক ভাইয়ের পায়ে লাগে। ওইটা দেখার পর মানুষ আরও ক্ষিপ্ত হয়ে যায়।"
দুপুরের দিকে জাহিদও আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। বনশ্রীর বিভিন্ন গলি ঘুরে পুলিশকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি দূর পর্যন্ত ঢিল ছুড়তে পারতেন বলে আশপাশের মানুষ টাইলস ভেঙে এনে দিচ্ছিল, আর তিনি তা ছুড়ে গলিতে আশ্রয় নিচ্ছিলেন।
সেই রক্তাক্ত বিকেল ও অলৌকিক বেঁচে ফেরা
বিকেলের দিকে সংঘর্ষ রামপুরা থানা ও মেরাদিয়া বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। ফেমাস স্পেশালাইজড হাসপাতালের সামনে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় হঠাৎ গলির ভেতর থেকে একটি গুলি এসে জাহিদের হাতে লাগে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওপরের ভবন থেকে আরেকটি গুলি এসে বিদ্ধ করে তার বুক।
রক্তাক্ত অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় পড়ে থাকার পর আন্দোলনকারী ও হাসপাতাল কর্মীরা তাকে টেনে ভেতরে নিয়ে যান। সেখানে তখন অন্তত ৫০ জন গুলিবিদ্ধ মানুষের আর্তনাদ। সেখান থেকে ‘সিয়াম’ নামের এক সাহসী তরুণের সহায়তায় ৫ জন গুরুতর আহতকে নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স ঢাকা মেডিকেলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পথেই মারা যান দুজন। রামপুরা গোলচত্বরে বিজিবি অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে জাহিদকে গুলি করার নির্দেশ দিলেও, দুজন মৃত দেখে এবং সাথে থাকা তরুণকে মারধর করে শেষ পর্যন্ত অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে দেয়।
হাসপাতাল জুড়ে আরেক যুদ্ধ
ঢাকা মেডিকেল কলেজে পৌঁছানোর পর শুরু হয় চিকিৎসা পাওয়ার অন্য এক যুদ্ধ। চারদিকে শুধু রক্তাক্ত মানুষ আর স্বজনদের আর্তনাদ। জাহিদ বলেন,
"আমাকে বেডও দেয়নি, বেডের পাশে শুইয়ে রাখছিল। পাশে একজন রক্তবমি করছিল, সেই রক্ত আমার মাথায় পড়তেছিল। মনে হচ্ছিল পুরো হাসপাতালটাই যুদ্ধক্ষেত্র।"
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন পুলিশ ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড পর্যন্ত ঢুকে পড়ে। পরে হাতের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট এবং সেখান থেকে নিটোরে (পঙ্গু হাসপাতাল) পাঠানো হয়। ২০ জুলাই ভোরে নিটোরের ওটিতে নেওয়ার সময়ও চিকিৎসকদের একাংশের কাছ থেকে কটূক্তি শুনতে হয় তাকে। পরে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরে তার ভাস্কুলার সার্জারি করা হলেও, গ্রেফতার ও ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলার আতঙ্কে তিনি বোনের বাসায় চলে যান এবং দীর্ঘদিন গোপনে চিকিৎসা নেন।
৫ আগস্টের অনুভূতি ও বর্তমান হতাশা
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের খবর যখন আসে, তখনো জাহিদের হাত ঝুলে ছিল, কিন্তু আনন্দে তার সব ব্যথা উবে গিয়েছিল। তবে পরক্ষণেই যখন দেখলেন মানুষ ভাঙচুর আর লুটপাটে মেতে উঠেছে, তখন তীব্র ক্ষোভ ও কষ্ট জড়ো হয় তার মনে। জাহিদ প্রশ্ন তোলেন, "আমরা কি এটার জন্য হাত দিলাম?"
বর্তমানে জাহিদের ডান হাতের তিনটি স্নায়ুই ক্ষতিগ্রস্ত এবং হাতটি প্রায় অচল। থেমে গেছে পড়াশোনা, হারিয়েছেন চাকরি। সরকারি সহায়তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন:
"আমাদের একটা স্বাস্থ্যকার্ড দিয়েছে। কিন্তু এতে বাড়তি সুবিধা কী? একটা এক্স-রে আর ইসিজি ছাড়া নতুন কী পেলাম? আজীবন ফ্রি চিকিৎসার কথা বলা হয়, বাস্তবে তো সেটা দেখি না।"
তবে চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি ফিজিওথেরাপির ক্ষেত্রে জুলাই ফাউন্ডেশন, কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং বেসরকারি সংস্থা 'ব্র্যাক'-এর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
সিস্টেম বদলানোর আকুতি
দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো মানসিক ট্রমা আর পঙ্গুত্ব নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন এই জুলাই যোদ্ধা। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জাহিদ বলেন,
"কিছু পরিবর্তন হয়েছে, সেটা অস্বীকার করব না। কিন্তু অনেক জায়গায় শুধু মানুষ বদলেছে, সিস্টেম বদলায়নি। আগে একদল ছিল, এখন আরেক দল বসেছে। সবচেয়ে কষ্ট লাগে, এখনো অনেক মানুষ চোখ রাঙায়। তখন মনে হয়, আমি কি এজন্য হাত হারালাম?"
সূত্র: ঢাকা মেইল
মানবকণ্ঠ/এমআর




Comments