Image description

রাজধানী ঢাকার যানজট এখন আর কেবল সমস্যা নয়, এটি এক ভয়াবহ নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্থবির হয়ে থাকছে তিলোত্তমা নগরীর প্রধান সড়কগুলো। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা, অনিয়ন্ত্রিত সড়ক ব্যবহার এবং নাগরিকদের দায়িত্বহীন আচরণে পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমান জ্বালানি সংকট।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। ফলে রাজধানীর প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে এখন যানবাহনের কিলোমিটারব্যাপী দীর্ঘ সারি। প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের এই লাইন মূল সড়ক ছাড়িয়ে ফ্লাইওভার পর্যন্ত ঠেকে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, খিলক্ষেতের একটি ফিলিং স্টেশনের লাইন ক্যান্টনমেন্ট ফ্লাইওভার ছাড়িয়ে জিয়া কলোনি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। একইভাবে তেজগাঁওয়ের লাইনের প্রভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মহাখালী পর্যন্ত যাতায়াত দুরূহ হয়ে পড়েছে। সড়কের একাংশ দখল করে এই অপেক্ষমাণ যানবাহনগুলো যান চলাচলের পথ সংকুচিত করে দিচ্ছে, যার ফলে ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশের কার্যকর ভূমিকা না থাকায় বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ছে। মহাখালীর এক কর্মজীবী যাত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ফিলিং স্টেশনের লাইনের কারণে বাস এক জায়গায় এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ দেখার কেউ নেই।" ঢাকা ইম্পিরিয়াল কলেজের প্রভাষক ফয়সাল বার্কের মতে, ফিলিং স্টেশনের সামনে আলাদা লেন বা ভারী যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ না করায় এই অরাজকতা সৃষ্টি হচ্ছে।

পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জ্বালানি নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় হওয়ায় বাসের দৈনিক ট্রিপ সংখ্যা কমে গেছে। দিশারী পরিবহনের এক চালক বলেন, "তেল না নিলে গাড়ি চলে না, আর লাইনে দাঁড়ালে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রীদের গালি শুনতে হয় আমাদের।" অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত মজুদ থাকার কথা বলা হলেও পাম্পগুলো থেকে তেল দিতে গড়িমসি করা হচ্ছে।

রাজধানীর এই স্থবিরতা কাটাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ ‘অড-ইভেন’ (জোড়-বেজোড়) ভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, "গাড়ির নম্বর প্লেট অনুযায়ী নির্ধারিত দিনে জ্বালানি নেওয়ার ব্যবস্থা করলে পাম্পগুলোর ওপর চাপ কমবে। তবে এটি বাস্তবায়নে কঠোর তদারকি ও সমন্বয় প্রয়োজন।"

ডিএমপি ট্রাফিক (রমনা বিভাগ) এর এডিসি কাজী রোমানা নাসরিন জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে সৃষ্ট এই অনাকাঙ্ক্ষিত জট সামলাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, "আমরা রশি টাঙ্গিয়ে আলাদা লেন করে দিচ্ছি এবং পাম্পগুলোতে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছি। তবে মানুষ আইন না মানলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আমরা জরিমানা করার চেয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে বেশি জোর দিচ্ছি।"

নগর বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা ফ্লাইওভার দিয়ে যানজট কমানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা এবং জ্বালানি সরবরাহের আধুনিক ব্যবস্থাপনা। অন্যথায় ঢাকা শহর অচিরেই স্থবিরতার এক জনপদে পরিণত হবে।

মানবকণ্ঠ/ডিআর