Image description

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকে থাকে তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর। ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য আকাশসীমার নিরাপত্তা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) এক অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একটি ঐতিহাসিক সত্য ও কৌশলগত বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, যদি চট্টগ্রাম বা কক্সবাজার অঞ্চলে আমাদের বিমানবাহিনীর শক্তিশালী অবস্থান এবং পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা থাকত, তবে হয়তো রোহিঙ্গা সংকটের মতো ভয়াবহ জাতীয় সমস্যার সৃষ্টিই হতো না।

সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য কেবল একজন সামরিক প্রধানের পেশাদার মূল্যায়ন নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার একটি গভীর ক্ষতকে নির্দেশ করে। যখন কোনো রাষ্ট্র তার সীমান্তে ন্যূনতম প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘ডিটারেন্স’ বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন প্রতিবেশী দেশগুলো আগ্রাসন চালানোর সুযোগ পায়। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছিল, তখন তাদের হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান বারবার বাংলাদেশের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। সেই সময়ে যদি আমাদের বিমানবাহিনীর সক্ষমতা দৃশ্যমান থাকত, তবে মিয়ানমার এমন ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস পেত না।

প্রতিরক্ষা যখন পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি
সেনাপ্রধান যথার্থই বলেছেন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ক‚টনীতি তখনই কাজ করে যখন তার পেছনে সামরিক শক্তির সমর্থন থাকে। বাংলাদেশ একটি শান্তিপ্রিয় দেশ, কিন্তু ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’, এই নীতির অর্থ এই নয় যে আমরা আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল রাখব। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন: ‘আজ আপনি যদি এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন, তবে ভবিষ্যতে হয়তো ৫০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে।’ রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, তা আজ কয়েক স্কোয়াড্রন আধুনিক যুদ্ধবিমানের দামের চেয়ে বহুগুণ বেশি। সুতরাং, প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ মানেই অপচয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের বিপর্যয় ঠেকানোর একটি বীমা।

আধুনিকায়নের পথে বাধার দেয়াল ও বিদেশি প্রোপাগান্ডা
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী যখনই আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয় এবং ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় উন্নত মাল্টি-রোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট (গজঈঅ) ক্রয়ের প্রক্রিয়া শুরু করে, তখনই দেশি-বিদেশি একটি কায়েমি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়ে ওঠে। লক্ষ্য একটাই, বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীল রাখা এবং বিমানবাহিনীকে দুর্বল করে রাখা।

এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ভারতের বিতর্কিত নিউজ পোর্টাল ‘নর্থইস্ট নিউজ’ এক কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সাংবাদিক চন্দন নন্দীর বরাত দিয়ে প্রচারিত সেই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ভেতরে নাকি পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর নেটওয়ার্ক পাওয়া গেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ বা দাপ্তরিক সূত্র ছাড়াই তারা দাবি করেছে যে বিমানবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

গুজবের অসারতা ও দেশীয় ষড়যন্ত্র
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বিদেশি প্রোপাগান্ডাকে জ্বালানি দিচ্ছে দেশের ভেতরে থাকা একশ্রেণির কুলাঙ্গার ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মিথ্যা সংবাদকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করছে। আমাদের বুঝতে হবে, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি অত্যন্ত দক্ষ এবং শক্তিশালী ফিল্ড ইন্টেলিজেন্স ইউনিট রয়েছে। বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং নিয়মিত নজরদারি অত্যন্ত কঠোরভাবে করা হয়। সেখানে কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের অনুপ্রবেশ ঘটা প্রায় অসম্ভব। চন্দন নন্দী নামক যে সাংবাদিক এই গুজব ছড়িয়েছেন, তার অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় তিনি এর আগেও বাংলাদেশকে নিয়ে একাধিক মিথ্যা ও বানোয়াট রিপোর্ট করেছেন। সুতরাং, এ ধরনের ‘হলুদ সাংবাদিকতা’র পেছনে যে বিশেষ কোনো গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ডা রয়েছে, তা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।

আকাশ প্রতিরক্ষা কেন এটি অপরিহার্য?
সেনাপ্রধানের বক্তব্যে নৌবাহিনীর সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছে। আমাদের সমুদ্রসীমা বিশাল, কিন্তু সেই তুলনায় নৌবাহিনীর ওপিভি বা বড় জাহাজের সংকট রয়েছে। সাগরে ছোট করভেট দিয়ে টহল দেয়া কেবল কষ্টসাধ্যই নয়, বরং অর্থনৈতিকভাবেও ব্যয়বহুল। বিমানবাহিনীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। দীর্ঘ সময় ধরে নতুন মাল্টি-রোল এয়ারক্রাফট না কেনায় আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি শূন্যতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আকাশসীমা যদি সুরক্ষিত না থাকে, তবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অর্থনৈতিক জোনগুলো সবসময় ঝুঁকির মুখে থাকবে। আধুনিক যুদ্ধে আকাশপথ যার নিয়ন্ত্রণে থাকে, জয় তারই নিশ্চিত হয়। তাই সেনাপ্রধান যখন সামরিক বিষয়াবলিতে নাগরিক ও নীতিনির্ধারকদের সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করেন, তখন বুঝতে হবে এটি জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার ডাক।

‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়’, সেনাপ্রধানের এই প্রবাদটি আজ বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিই না, আমরা প্রস্তুতি নিই যাতে কেউ আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার সাহস না পায়। যারা বিমানবাহিনীকে নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে বা আধুনিকায়নের বিরোধিতা করছে, তারা মূলত দেশের সার্বভৌমত্বের শত্রু।

একটি শক্তিশালী ও আধুনিক বিমানবাহিনী গড়ে তোলা এখন কেবল সামরিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রতীক। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের বানোয়াট প্রতিবেদন আর দেশীয় দালালদের ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার সময় এসেছে। আমরা এমন একটি বাহিনী চাই যা হবে সম্ভাব্য শত্রুদের জন্য কার্যকর প্রতিরোধ এবং জাতির গর্বের স্থল। আকাশ যখন সুরক্ষিত থাকবে, তখনই দেশের মাটি ও মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারবে। কোনো ষড়যন্ত্রই যেন আমাদের এই অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে না পারে, আজকের দিনে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক