দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল স্থলবন্দরে পচনশীল পণ্যের মাঠে গড়ে উঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারসাজিতে শুল্ককর ফাঁকির রামরাজত্ব চলছে। বন্দরের কাঁচামাল ইয়ার্ডে গড়ে উঠা সিন্ডিকেট চক্রের হাত দিয়ে অবৈধ পণ্যের চালান নিমেষেই চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাতে। এতে রাজস্ব আদায়ে ধ্বস নেমেছে বন্দরে। শুল্ককর ফাঁকি আর অ-ব্যবস্থাপনার নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিনত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকৃত পচনশীল পণ্য চালানে মাছ ও ফলের মধ্যে লুকানো থাকে উচ্ছ শুল্কযুক্ত ও মিথ্যা ঘোষনার পণ্য। পরীক্ষণ কর্মকর্তারা পণ্য চালান পরীক্ষণের সময় ট্রাকের পেছন ও উপর থেকে কয়েকটি কার্টুন ও ট্রে নামিয়ে পরীক্ষণ সম্পূর্ন করেন। ফলে অধরা থেকে যায় মিথ্যা ঘোষণার আনা পন্য চালান। পরীক্ষণ দুর্নীতিবাজ কর্মকার্তাদের অর্থ লোভের কারনে আক্রান্ত হচ্ছে রাজস্ব প্রশাসনের নৈতিক ভিত্তি আর হুমকির মুখে পড়েছে প্রশাসনিক শুদ্ধাচার।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে কাঁচামাল পণ্যের ট্রাক প্রতি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ঘুষের চিত্র, মাছের ট্রাক প্রতি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, আনারের ট্রাক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, আপেলের ট্রাক ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা, কমলার ট্রাক ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা, কেনুর ট্রাক ২০ হাজার টাকা, আঙ্গুরের ট্রাক ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং পানের ট্রাক ১০ হাজার টাকা করে আদায় করে দায়িত্বরত পরীক্ষণ কর্মকর্তারা এবং আদায়কারীদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে থাকে। তাছাড়া এই পচনশীল পণ্যের শুল্কায়ন গ্রুপ-১ এর রাজস্ব কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম কনসাইনমেন্ট প্রতি ৫ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে থাকেন আর এই ঘুসের টাকা বাঁশকল থেকে উত্তোলন করেন তার (এনজিও) ওমর।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, বেনাপোল বন্দরে শুল্ক ফাঁকি প্রধান উৎস হলো পরীক্ষণ রিপোর্টের কারনে আমদানিকৃত পণ্য চালান কায়িক পরীক্ষা শেষে শুল্কারোপসহ শুল্কায়ন করা হয়ে থাকে। শুল্কায়ন গ্রুপের কর্মকর্তারা পরীক্ষণ কর্মকর্তার নথী পর্যালোচনা করে শুল্কায়নের আগে পণ্যের প্রকৃতি, পরিমাণ, ওজন ও মান যাচাই বাছাইসহ ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব এন্ট্রি, এলসি কাগজপত্রের সাথে পণ্যের মিল আছে কি না তা নিশ্চিত সহ সন্দেহজনক চালান চিহ্নিত হলে পূনরায় পরীক্ষণ করতে পারেন। কিন্তু পরীক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী শুল্কায়ন শাখায় বসে পণ্য চালান খালাস করে থাকেন দু-একটি চালান পূনরায় দেখার কথা বললে পচনশীল পণ্যের অজুহাতে একটু বাড়তি টাকায় মিলে যায় পণ্য খালাশ।
বন্দর সূত্রে জানা যায়, বর্তমান বেনাপোল বন্দরে গভীর রাত পর্যন্ত পচনলীল পণ্যে প্রবেশ করে। দিনে প্রবেশকৃত ট্রাক গুলো শুল্কফাঁকির পণ্য কম আসে কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরে যে গাড়িগুলো প্রবেশ করে সে সকল পণ্যের ট্রাক গুলোতে পরীক্ষণ কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে কোন পরীক্ষণ না করেই ভারতীয় গাড়ী টু বাংলা গাড়ীতে লোড দিয়ে বন্দরে থেকে খালাশ নিয়ে চলে যায়।
এছাড়া শুল্কফাঁকির চক্রটি দ্রুত খালাশের নামে চালাকি করে শুল্কফাঁকির ট্রাক গুলো “দিনে শুল্কায়ন চালানের কাগজপত্র চালানের কাগজপত্র ব্যবহার করে”। ভারত থেকে রাতে আগত ট্রাক গুলোতে বৈধ পণ্যের সাথে লুকিয়ে আনা হয় উচ্চ শুল্কযুক্ত পণ্য। তার মধ্যে জিলেট ব্লেড,ঔষধ, নিশিদ্ধ মেডিসিন, শাড়ী থ্রি-পিসসহ আগ্নেয় অস্ত্রের চালানও চলে যাচ্ছে অহরহ। গাড়ি থেকে গাড়ি লোডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বর্তমান কাঁচামালের মাঠ “রাজস্ব ফাঁকির রাতের বাজার” বলে আখ্যায়িত করেছেন।
গত ১৩ জানুয়ারি-২৬ রাতে বেনাপোল বন্দরের ৩১ নম্বর কাঁচামালের শেডে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঘোষনাবর্হিভূত আমদানিকৃত দুটি ভারতীয় মাছের ট্রাক (ডাব্লু বি-২৫কে-৩০২৯ ও ডাব্লু বি ১১ই-৫০২৭) মাছের ট্রাক আটক করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। চালানটিতে শুল্কফাঁকির প্রায় সাড়ে ৩ টন ইলিশ মাছ পাওয়া যায়। যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা।
গত ৫ই আগষ্ট-২৪ আ.লীগ সরকার পতনের পর দীর্ঘ দেড় বছর পর কাঁচামালের শেড থেকে শুল্কফাঁকির চালান আটকের ঘটনা এটিই প্রথম। গত ১১ জানুয়ারি-২৬ বেনাপোল পোর্ট থানার রঘুনাথপুরে র্যাবের অভিযানে দুটি বিদেশি পিস্তল, ছয় রাউন্ড গুলি ও চারটি ম্যাগজিন উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় সাকিব হাসান নামে এক যুবককে আটক করে র্যাব। সাকিব বেনাপোল বন্দরে একটি কাঁচামাল আমদানিকারকের অফিসে কাজ করত বলে জানা যায়। গত ৭ সেপ্টেম্বর-২০২৫ আমদানিকৃত কাঁচা মরিচের আড়ালে লুকানো ভারতীয় সিজি-০৪-পিইউ-৫২৮৮ নম্বরের ট্রাক থেকে একটি পিস্তল ও ৯৩ রাউন্ড গুলিসহ দুই ভারতীয় নাগরিককে আটক করে (বিজিবি)।
আমদানিকারকরা জানান, পরীক্ষণ রিপোর্ট অনুসারে গ্রুপ শুল্কায়ন কর্মকর্তা পণ্য খালাশের অনুমতি প্রদান করে থকে সরাসরি পণ্যর তারতম্য পরীক্ষণের সময় বুঝতে পারে। আবার নিয়মমাফিক ঘুষ নেওয়ার কারনেও তারা শতভাগ পরীক্ষণ করে না। ঘুষের কারনে পরীক্ষণ রিপোর্ট মিলে যায় ১০০% সঠিক। একারনে শুল্কফাঁকি রোধে প্রতিটি পরীক্ষণের সময় বিজিবিকে রাখা হলে শুল্কফাঁকি জিরো টলারেন্সে নেমে যাবে।
এছাড়া পণ্য চালান লোডের সময় বিজিবির চেকিং ইউনিট রাখতে হবে। দ্রুত পচনশীল পন্য খালাসের নামে শুল্কফাঁকির লাগাম টানতে বেনাপোল বন্দরের ৩১ নম্বর ট্রানশিপমেন্ট ইয়ার্ডের ছোটআঁচড়া গেটে বিজিবির বাঁশকল চেকিং রাখলে থেমে যাবে শুল্কফাঁকি। দেশের কল্যানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আসবে বিরাট সাফল্য।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বেনাপোল ৩১ নং শেডের মাঠে শুল্কফাঁকির একটি চক্র তাদের কনসাইনমেন্ট প্রতি কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে কোটি কোটি টাকা শুল্কফাঁকিতে লিপ্ত রয়েছে। বন্দরে গড়ে উঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কবলে গত ৬ মাসে ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। দেশের চালিকাশক্তি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এমন স্থাপনায় রাজস্ব আদায় সহ নিরাপত্তার স্বার্থে (বিজিবি’র) মত পেশাদার বাহিনী দ্বারা বন্দরে যৌথভাবে শুল্কায়নে নিয়জিত করা হলে শুল্কফাঁকির চিত্র বদলে যাবে। তাছাড়া বেনাপোল বন্দরে বসানো ট্রাক স্ক্যানিং মেশিন চালু করলেই বাণিজ্য ঝুঁকি কমবে এই বন্দরে।
শার্শা উপজেলা শাখার দুর্নীতি দমন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আক্তারুজ্জামান বলেন, বেনাপোল বন্দরের পচনশীল পন্য সিন্ডিকেটের কথা শুনেছি এবং সেখান দিয়ে শুল্ক ফাঁকির ঘটনা ঘটছে। বিগত ২০২৪ সালে কাগজপত্রবিহীন ও চোরাচালান পণ্যের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সন্ধ্যা ৬টার পর পচনশীল পণ্য বন্দরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলো কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া দেশের স্বার্থ ও রাজস্ব আহরণে বিশেষ বাহিনী দ্বারা পর্যবেক্ষণ করলে রাজস্ব ফাঁকি হ্রাস পাবে বলে মনে করছি।
যশোরের আমদানিকারক ফরিদুল ইসলাম জানান, বেনাপোল বন্দরে গত ৬ মাসে ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় ঘাটতি হয়েছে। শুল্কফাঁকির পণ্য চালান আটকসহ বাণিজ্য সহজীকরণ, চোরাচালান রোধ ও সময় বাঁচানোর জন্য স্ক্যানিং মেশিন অপরিহার্য। এটা চালু না হওয়া মানে নিরাপদ বাণিজ্যের পথে বড় বাঁধা।
সচেতন মহলের দাবি, বেনাপোল সিন্ডিকেট চক্র ভেঙে না দিলে বন্দর এলাকায় স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ফিরবে না। দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি বেনাপোলে পচনশীল পণ্যে যদি শুল্ক ফাঁকি ও অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয় তবে তা জাতীয় স্বার্থের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সহ শুল্কফাঁকির সিন্ডিকেটের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।




Comments