Image description

বেশ কিছুদিন হলো দেশের সব ব্যবসায়িক খাতে অস্থিরতার প্রভাব দেখা গেছে। বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন থেকে শুরু করে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা এ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। মজুরি নিয়ে আন্দোলন, সরকার পতনের পর ঝুট ব্যবসার আধিপত্য নিয়ে কারখানায় হামলা, বেতন নিয়ে আন্দোলন। এসব নিয়ে এ খাতে চরম অস্থিরতা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেশক্তির কারণে সংকট কেটে উঠছে। আরো ভালো খবর হচ্ছে- অদম্য রয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি), জানুয়ারি পর্যন্ত গত ছয় মাস ধরে অব্যাহত রপ্তানির কার্যাদেশও পেয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো প্রধান বাজারগুলোয় পোশাকের খুচরা বিক্রেতা ব্র্যান্ডগুলোর ভোক্তাচাহিদা বাড়ায়- এসব ক্রেতারা ক্রয়ও বাড়াচ্ছে। চীন থেকে রপ্তানির কার্যাদেশের স্থানান্তর ঘটছে, যার পেছনে রয়েছে চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের শুল্কারোপের পরিকল্পনা। এ ঘটনাও বাংলাদেশের পোশাক খাতকে বাড়তি সহায়তা করেছে। রপ্তানি কার্যাদেশের বিদ্যমান প্রক্ষেপণ অনুযায়ী- পোশাকশিল্পের ব্যবসায়ী নেতারা ২০২৫ সালে ১০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হবে বলে মনে করছেন। তবে রপ্তানির এই চাঙ্গাভাব অপ্রত্যাশিত নয়, কারণ বাংলাদেশের কারখানাগুলো নিট ও ওভেন দুই ধরনের আউটারওয়্যার উৎপাদনে বিশেষায়িত, যার এখন উচ্চ চাহিদা চলছে।

 গত বছরের ৫ আগস্টে ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও শ্রম অসন্তোষের আশঙ্কা কাজ করছে, এরমধ্যেও ধারাবাহিকভাবে কার্যাদেশ বা অর্ডার আসাটাই ছিল অপ্রত্যাশিত। তবে সুখবর হলো-  তেমনটাই ঘটেছে। বিষয়টি শুধু এ খাতের জন্য নয়, দেশে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে নেতিবাচক হচ্ছে- বর্তমানে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির চাপে আছেন ব্যবসায়ীরা। এই সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে পণ্য ও সেবা বিক্রি কমে যাওয়ায় বিপরীতমুখী চাপে আছেন তারা। 

এ পরিস্থিতিতে তাদের নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ নেই। স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও বিনিয়োগবান্ধব হতে পারেনি দেশ। এখনো একজন বিনিয়োগকারীকে দেশে বিনিয়োগ করতে হলে ২৯টি প্রতিষ্ঠান থেকে ১৪১টি ছাড়পত্র নিতে হয়। এই জটিলতার পরও সরকারের দেয়া সেবার মূল্য ও কর বৃদ্ধি অব্যাহত। এসবের সঙ্গে আছে উচ্চ সুদের হার, ঋণপত্রে জটিলতা, বেতন-বোনাস, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় ও ডলার দর বৃদ্ধিতে এখন নাজেহাল অবস্থা। 

সার্বিকভাবে এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা গোটাতে চাচ্ছেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি স্বরূপ। এই পরিস্থিতিতে এ খাতের ইমেজ পুনরুদ্ধারে শিল্পের নিরাপত্তার পাশাপাশি সরকারের সহযোগিতা চাইছেন ব্যবসায়ীরা। নিরাপত্তা সংকট ও শ্রমিক বিক্ষোভ বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য উদ্বেগের কারণ। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ খাত মুখ থুবড়ে পড়বে। 

অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, শ্রম অসন্তোষ, রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের মতো নানা প্রতিক‚লতার মুখেও মাঝারি ধরনের প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারা নিয়ে এই মুহূর্তে সন্তুষ্ট থাকা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধের সুফলও বাংলাদেশ পাবে। তবে এজন্য অবশ্যই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নতি হতে হবে। এসব সংকট সমাধান করতে পারলে আরো এগিয়ে যাবে এ খাত। দেশের অর্থনীতি বাঁচাতে জরুরি পদক্ষেপ নেয়াটাই সঠিক সিদ্ধান্ত হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীরা আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছাতে না পারলে ক্ষতির কবলে পড়বে দেশের অর্থনীতি।

এ সংকট দ্রুত সমাধান করা সম্ভব না হলে দেশের পুরো শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। দেশে এ সংকট মুহূর্তে পরিবর্তিত রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে এ দেশ আমার, আমাদের। বাংলাদেশের অর্থনীতির তিন প্রধান চালিকা শক্তির একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। অবিলম্বে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। 

ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে এদেশে ‘গণঅভ্যুত্থান’ ঘটেছে, এ বিষয়টি এত সহজে ভুলে গেলে চলবে না। সদ্য গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বিষয়টি সমাধানের জন্য বুদ্ধিভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য অবশ্যই দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ অন্যান্য অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির উন্নতি হতে হবে। সময়ক্ষেপণ না করে-এ ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার কোনো বিকল্প নেই।