Image description

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব যেভাবে বাড়ছে, তা নিঃসন্দেহে জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। বিশেষ করে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংক্রমিত রোগীদের মাধ্যমেই হাসপাতাল ও পরিবারে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অর্থাৎ, চিকিৎসা নেয়ার স্থানই হয়ে উঠছে সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। এই বাস্তবতা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে আসে। এটি কেবল একটি মৌসুমি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; বরং এটি আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। 

বিশেষ করে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে হাসপাতালগুলোই এখন অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। হাম যে একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, তা বহুদিন ধরেই জানা। একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত টিকা না নেয়া শিশু সংক্রমিত হতে পারে, এই পরিসংখ্যানই এর ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট। তবুও বাস্তবতা হলো, আমাদের হাসপাতালগুলোতে এখনো পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। শয্যা সংকটের কারণে একই ওয়ার্ডে হাম, চিকেনপক্স, এমনকি অন্যান্য সংক্রামক রোগের রোগীদের একসঙ্গে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। পরিস্থিতি জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে সংস্থাটি। 

বাংলাদেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়ানো, বিশালসংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের অভাবে এ রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতায় ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাবলির আলোকে সংস্থাটির গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ মূল্যায়ন করা হয়। এই পরিস্থিতিতে ‘ক্রস ইনফেকশন’ এখন একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এক রোগী থেকে আরেক রোগীর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া শুধু হাসপাতালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে ‘চেইন অব ট্রান্সমিশন’-এর মাধ্যমে। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের দেড় বছর বয়সী শিশু তাহমিনার ঘটনা এই সংকটের একটি করুণ উদাহরণ। একটি রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অন্য একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি বৃহত্তর ব্যবস্থাগত ব্যর্থতার প্রতিফলন। চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে হয়, সেখানেই যদি রোগীর নতুন করে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, হামসহ সব সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে আইসোলেশন বাধ্যতামূলক। 

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রোগীর চাপ বাড়লেও সেই অনুযায়ী অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। অনেক হাসপাতালে পৃথক ওয়ার্ড তো দূরের কথা, ন্যূনতম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও সঠিকভাবে কার্যকর করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় অস্থায়ী শয্যা বৃদ্ধি, পৃথক আইসোলেশন ইউনিট স্থাপন, এমনকি জরুরি প্রয়োজনে তাঁবু বা ফিল্ড হাসপাতাল গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশনা-শয্যার অভাবে কোনো রোগীকে ফিরিয়ে না দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র নির্দেশনা দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং দ্রুত অবকাঠামো সম্প্রসারণ। পাশাপাশি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি, যাতে নির্দেশনা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা। 

হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ, সময়ের মধ্যে টিকা গ্রহণ করলে এর ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কিন্তু এখনো দেশের অনেক শিশু পূর্ণ টিকাদানের আওতায় আসছে না। এর পেছনে রয়েছে সচেতনতার অভাব, ভ্রান্ত ধারণা এবং কখনো কখনো স্বাস্থ্যসেবার সীমিত প্রাপ্যতা। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি বহাল থাকছে। অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়া, এই তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিরোধ। টিকাদান কর্মসূচি জোরদার না করলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। 

বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। এটি কেবল একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়; এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা, পরিকল্পনা এবং দায়িত্ববোধের একটি পরীক্ষা। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে এই প্রাদুর্ভাব আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। অতএব, সময় এসেছে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের- সরকার, স্বাস্থ্যখাত, গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই কেবল এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও প্রস্তুত করতে না পারলে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন এবং আরও ভয়াবহ রূপে ফিরে আসতে পারে।