পাহাড়ি জনপদে জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী "বাঁশের চুঙায়" রান্না
শীতের কনকনে সন্ধ্যা। চারদিকে কুয়াশার চাদর। এমন সময়ে আগুনের হালকা আঁচে পোড়া বাঁশের মিষ্টি সুবাস বাতাসে ভেসে আসছে। কাছে যেতেই দেখা গেল, সারিবদ্ধভাবে সাজানো বাঁশের টুকরো থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। ভেতরে ফুটছে মাংস কিংবা মাছের তরকারি। এটি কেবল রান্নার কোনো পদ্ধতি নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠী’র হাজার বছরের লালিত এক ঐতিহ্য।
পার্বত্য অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছে এই রান্না ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। চাকমারা একে বলে ‘চুমো গরাং’, তঞ্চঙ্গ্যারা বলে ‘চুমাদুখকে’। এছাড়া ত্রিপুরারা 'ওয়াচংগোপেংজাক', পাংখোয়ারা 'রুয়াটাইমুং', বমরা 'চংমুং', ও মারমা সম্প্রদায়ের মধ্যেও নিজস্ব নামে এই আদিম রান্না কৌশলটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। মূলত বনের গভীরে বা পাহাড়ে কাজ করার সময় হাঁড়ি-পাতিলের বিকল্প হিসেবে এই বাঁশের চুঙার ব্যবহার শুরু হয়েছিল।
সব বাঁশ এই রান্নার জন্য উপযুক্ত নয়। সাধারণত মুলি বাঁশ বা জলবাঁশ ব্যবহার করা হয়। ৩-৪ ইঞ্চি ব্যাসের কাঁচা বাঁশ কেটে একদিকের গিঁট অক্ষত রেখে তৈরি করা হয় প্রাকৃতিক পাত্র।
আগুনের তাপে বাঁশের ভেতরের প্রাকৃতিক রস বা নির্যাস তরকারির সঙ্গে মিশে যায়। এতে খাবারে যোগ হয় এক অনন্য মাটির সুবাস ও মিষ্টি স্বাদ।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, বাঁশের ভেতরের মিনারেলস বা পুষ্টিগুণ এই পদ্ধতিতে রান্নার ফলে সরাসরি খাবারে যুক্ত হয়।
প্রথমে মাছ, মাংস বা সবজিকে দেশি মশলা, আদা, রসুন, পেঁয়াজ ও তেল দিয়ে ভালোভাবে মেখে নেওয়া হয়। এরপর মশলাযুক্ত সেই মিশ্রণ বাঁশের ভেতরে ঢুকিয়ে মুখটি কলাপাতা বা অন্যকোন সুগন্ধি পাতা দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর টানা ৪০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা আগুনের আঁচে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পোড়ানো হয়। যখন বাঁশের বাইরের অংশ কালো হয়ে যায় এবং বুদবুদ শব্দ বন্ধ হয়, তখনই বোঝা যায় রান্না সম্পন্ন। এরপর চুঙাটি লম্বালম্বিভাবে ফালি করে পরিবেশন করা হয় ধোঁয়া ওঠা গরম তরকারি।
শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের পাহাড়ি হোটেল এবং রেস্তোরাঁগুলোতে এই খাবারের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। সন্ধ্যা নামার আগেই স্থানীয় ও পর্যটকদের ভিড় জমে ওঠে এসব দোকানে। কোন কোন স্থানীয় এলাকায় রাস্তার পাশে অস্থায়ীভাবে এসব চুঙায় রান্না বিক্রি করতে দেখা যায়।
সরেজমিনে কথা হয় দুরন্ত চাকমা নামে এক ভোজনরসিকের সাথে। তিনি জানান, "শীতের তীব্রতা যত বাড়ছে, চুঙায় রান্নার আমেজ ততটাই জমে উঠছে।" আরেক ভোজনরসিক অন্তর চাকমা বলেন, "কনকনে শীতে আগুনের আঁচে তৈরি এই ধোঁয়াটে স্বাদের তরকারি খাওয়ার অনুভূতি বলে বোঝানো সম্ভব নয়।"
একটি বাঁশের চুঙায় যে পরিমাণ রান্না হয়, তা অনায়াসেই ৪ থেকে ৫ জন মিলে ভাগ করে খাওয়া যায়। প্রতি চুঙা খাবারের দাম পড়বে মাত্র ১৫০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে। কোনো প্লাস্টিক বা ক্ষতিকারক ধাতব পাত্রের ব্যবহার না থাকায় এটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব।
আধুনিক যুগে যখন রান্নার ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তখন পাহাড়ের এই ‘বাঁশ রান্না’ আজও নিজের স্বকীয়তা আর স্বাদ নিয়ে টিকে আছে ভোজনরসিকদের হৃদয়ে।




Comments