আল-জাজিরার বিশ্লেষণ
ঢাকায় জয়শঙ্কর-সাদিক করমর্দন: তিক্ততা পেরিয়ে কি নতুন সংলাপে ভারত-পাকিস্তান?
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঢাকায় এক বিরল কূটনৈতিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো বিশ্ব। দীর্ঘদিনের চরম বৈরিতা ও সাম্প্রতিক ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের আবহে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ও পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিকের মধ্যকার সৌজন্যমূলক করমর্দন ও সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের একটি অপেক্ষমাণ কক্ষে এই ঘটনা ঘটে। উপস্থিত কূটনীতিকদের মতে, এটি ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। পাকিস্তানের স্পিকার আয়াজ সাদিক একটি সাক্ষাৎকারে জানান, জয়শঙ্কর নিজেই এগিয়ে এসে তাঁর সঙ্গে হাসিমুখে হাত মেলান। সাদিক যখন নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলেন, তখন জয়শঙ্কর বলেন, ‘এক্সেলেন্সি, আমি আপনাকে চিনেছি, আলাদা করে পরিচয়ের দরকার নেই।’
এই সৌজন্যের ছবি পাকিস্তানের স্পিকারের দপ্তর এবং বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে প্রকাশ করা হয়েছে।
এই করমর্দনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এর মাত্র কয়েক মাস আগে ভারতের পুরুষ ও নারী ক্রিকেট দল পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এছাড়া ২০২৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসে দুই দেশের মধ্যে ভয়াবহ সীমান্ত সংঘাত ও আকাশযুদ্ধ সঙ্ঘটিত হয়, যা দেশভাগের পর থেকে চলা বৈরিতাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। এমনকি ভারত ছয় দশক পুরনো ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ও স্থগিত করে রেখেছে। এই চরম উত্তেজনার মাঝে জয়শঙ্করের এমন আচরণকে অনেকেই ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে দেখছেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের বিশ্লেষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি: ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক মুস্তাফা হায়দার সাঈদের মতে, নতুন বছরের শুরুতে এই করমর্দন অন্তত স্বাভাবিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনার একটি ইতিবাচক বার্তা। পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক সরদার মাসুদ খান মনে করেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত ছাড়া জয়শঙ্কর এমন কাজ করতেন না।
সংশয়ী দৃষ্টিভঙ্গি: অন্যদিকে ভারতের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক রেজাউল হাসান লস্কর বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাঁর মতে, একই কক্ষে থাকা দুই নেতার এটি কেবলই একটি সাধারণ সৌজন্য বিনিময়। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই করমর্দনের কোনো ছবি প্রকাশ করেনি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি দুই দেশকে পুনরায় ভাবাতে পারে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামাবাদের সঙ্গে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাকিস্তানের প্রতি নমনীয় অবস্থান ভারতের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
মুস্তাফা হায়দার সাঈদ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ভারত হয়তো বুঝতে পেরেছে যে পাকিস্তানকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে এগোনো সম্ভব নয়। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অন্তত ন্যূনতম যোগাযোগ বজায় রাখা দুই দেশের জাতীয় স্বার্থেই জরুরি।’
ঢাকার এই সংক্ষিপ্ত করমর্দন কি ২০২৬ সালে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কের জমে থাকা বরফ গলাতে সাহায্য করবে, নাকি এটি কেবলই একটি বিচ্ছিন্ন সৌজন্য—তা সময়ই বলে দেবে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে এই মুহূর্তটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ইঙ্গিত হয়ে রইল।
মানবকন্ঠ/আরআই




Comments