চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামে এখন সবুজের মাঝে হলুদের মেলা। সারিবদ্ধ গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে কমলা আর হলুদ রঙের রসালো কমলা। শীতের মিষ্টি রোদে ঝিলমিল করা এই দৃশ্য শুধু পথচারীদের চোখ জুড়াচ্ছে না, বরং বদলে দিচ্ছে জেলার কৃষি অর্থনীতি আর শত শত শিক্ষিত তরুণের জীবন। এক সময়ের আমদানিনির্ভর এই ফল এখন চুয়াডাঙ্গার মাটিতে ফলেছে বিপুল সম্ভাবনার বার্তা নিয়ে।
জীবননগরের সজল আহমেদ এই পরিবর্তনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ২০০৯ সালে কোনো জমি না থাকায় সাত বিঘা জমি লিজ নিয়ে কৃষি জীবন শুরু করেছিলেন। এরপর ইউটিউব এবং কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে তিনি ১৩৯ বিঘা জমির বিশাল ফলের বাগানের মালিক। তাঁর বাগানে ১৯৭ প্রজাতির মালটা ও কমলাসহ প্রায় ৫৫০ প্রজাতির ফল রয়েছে। সজল আহমেদ জানান, চলতি মৌসুমে সব খরচ বাদ দিয়ে তাঁর এক কোটি টাকা লাভের আশা রয়েছে। তাঁর এই কর্মযজ্ঞে বর্তমানে অর্ধশতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
একই এলাকার মো. আব্দুল্লাহ একসময় ব্যবসায় বারবার লোকসান দিয়ে দিশেহারা ছিলেন। ছয় বছর আগে দুই বিঘা জমিতে কমলা চাষ শুরু করেন তিনি। গত কয়েক বছরে চারা ও ফল বিক্রি করে তিনি অর্ধকোটি টাকার বেশি আয় করেছেন। তাঁর চাষ করা দার্জিলিং ও চায়না জাতের কমলার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
দামুড়হুদার জয়রামপুর গ্রামের দুই ভাই আনিছুর রহমান তারিক ও জামাল উদ্দীন করোনাকালে চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে হতাশ না হয়ে কমলা চাষে মন দেন। বর্তমানে প্রতি বিঘায় তাদের ৪ লাখ টাকা লাভ হচ্ছে। অন্যদিকে, জেলাজুড়ে এই বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত চাষি ওমর ফারুক খান। ২০১৫ সালে তাঁর হাত ধরে শুরু হওয়া এই বাণিজ্যিক চাষ এখন চুয়াডাঙ্গার প্রধান অর্থকরী ফসলের একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী:
মোট আবাদ: জেলায় বর্তমানে ৭৮ হেক্টর জমিতে কমলা চাষ হচ্ছে।
উপজেলা ভিত্তিক আবাদ: জীবননগরে ৫২ হেক্টর (সর্বোচ্চ), আলমডাঙ্গায় ১০ হেক্টর, দামুড়হুদায় ১১ হেক্টর এবং সদরে ৫ হেক্টর।
উৎপাদন ও বাজারমূল্য: চলতি অর্থবছর উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৯০ টন। যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ৫৩ কোটি টাকা।
কর্মসংস্থান: প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে এই খাতের মাধ্যমে।
চুয়াডাঙ্গার কমলা স্বাদ ও রঙে আমদানিকৃত কমলার চেয়েও ভালো বলে দাবি করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা। জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন ও দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, এখানকার মাটি ও জলবায়ু কমলা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন বলেন, "চুয়াডাঙ্গার এই সাফল্য দেশের ফল আমদানির নির্ভরতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে। শিক্ষিত তরুণরা যেভাবে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে আসছে, তাতে বাংলাদেশ অচিরেই ফলের রাজ্যে পরিণত হবে।"
শীতের সকালে বাগান থেকে সদ্য পাড়া সতেজ কমলার ঘ্রাণে এখন মাতোয়ারা চুয়াডাঙ্গা। বেকারত্ব দূর করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনার এই ‘হলুদ বিপ্লব’ এখন দেশের অন্যান্য জেলার কৃষকদের জন্যও এক অনন্য প্রেরণা।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments