মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আবারও নিশ্চিত করেছে যে, গত সপ্তাহের শেষে ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাতের পর তারা দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
গত বুধবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট এক সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার বিষয়ে কথা বলেন। সেখানে ভেনেজুয়েলার শাসনে ট্রাম্পের ভূমিকার সীমা নিয়ে তাকে সাংবাদিকদের একের পর এক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।
লিভিট উত্তর দেন, “আমরা অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষের সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখছি। তাদের সিদ্ধান্তগুলো এখন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বারাই নির্ধারিত বা নির্দেশিত হবে।”
ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ফক্স নিউজ-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি জানান, ট্রাম্পের অগ্রাধিকারগুলো নিশ্চিত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করবে।
ভ্যান্স বলেন, “মানুষ প্রায়ই জিজ্ঞেস করে: আপনি কীভাবে ভেনেজুয়েলাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন? আমরা এখন বাস্তবে তা ঘটতে দেখছি। আমরা দেশটির অর্থের উৎস এবং জ্বালানি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছি। আমরা বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি—আপনারা তেল বিক্রি করতে পারবেন, তবে ততক্ষণই যতক্ষণ আপনারা আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবেন।”
তবে ভেনেজুয়েলার প্রকৃত ক্ষমতায় কে আছে, তা নিয়ে এখনো চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে।
গত শনিবার ভোরে ট্রাম্প প্রশাসন প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক ও ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য ভেনেজুয়েলায় একটি সামরিক অভিযান চালায়। এই উৎখাতকে মার্কিন প্রশাসন একটি ‘আইন প্রয়োগকারী অভিযান’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মাদুরো ও ফ্লোরেসকে বর্তমানে নিউইয়র্ক সিটিতে রাখা হয়েছে, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে ‘যুক্তরাষ্ট্রে টন টন কোকেন’ পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
হামলার ঠিক পরেই এটা স্পষ্ট ছিল না যে ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরো সরকারের অবশিষ্টাংশকেও সরিয়ে দেবে কি না। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্ট থেকে দেওয়া এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেন যে, দেশটি এখন মার্কিন নিয়ন্ত্রণে।
ট্রাম্প বলেন, “যতক্ষণ না আমরা একটি নিরাপদ, যথাযথ এবং বিচারিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পন্ন করতে পারছি, ততক্ষণ আমরাই দেশটি পরিচালনা করব। আমরা চাই না অন্য কেউ এসে পরিস্থিতি আবার আগের মতো করে ফেলুক। তাই আমরাই এখন দেশ চালাব।”
রদ্রিগেজের দাবি: ‘কোনো বিদেশি শক্তি শাসনে নেই’
তবে এরপর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তারা দ্রুত নতুন নেতা নির্বাচনের চেয়ে ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেবে। নতুন নির্বাচনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
লিভিট বুধবার বলেন, “ভেনেজুয়েলায় নির্বাচনের সময়সূচী নির্ধারণ করার জন্য এটি অত্যন্ত অপরিপক্ক এবং আগাম সময় হবে।”
চলতি সপ্তাহের শুরুতে মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, ভেনেজুয়েলার তেল উত্তোলন ও বিক্রির স্বার্থে তারা রদ্রিগেজের সাথে কাজ করবে।
তবে রদ্রিগেজ সরকার এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের বর্ণনায় ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। হোয়াইট হাউসের মতে, রদ্রিগেজ মার্কিন নির্দেশ মেনে চলতে বাধ্য। ট্রাম্প গত রবিবার ‘দ্য আটলান্টিক’ ম্যাগাজিনকে বলেন, “সে যদি সঠিক কাজ না করে, তবে তাকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে, সম্ভবত মাদুরোর চেয়েও বড় মূল্য।”
ইতোমধ্যেই ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, ভেনেজুয়েলা ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে, যা যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করবে। ট্রাম্প লিখেছেন, “সেই অর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, যাতে এটি ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উপকারে ব্যবহৃত হয়।”
অন্যদিকে, রদ্রিগেজ সরকার বারবার অস্বীকার করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুতুলের মতো নাচাচ্ছে। যদিও রদ্রিগেজ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন, তবে কোনো বিদেশি শক্তি দেশ চালাচ্ছে—এই ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তিনি বলেন, “আমরা জনগণের সাথে মিলে শাসন করছি। ভেনেজুয়েলার সরকারই দেশ চালাচ্ছে, অন্য কেউ নয়। ভেনেজুয়েলায় কোনো বিদেশি প্রতিনিধি শাসন করছে না।”
মাদুরো আমলের নীতিরই প্রতিফলন?
মাদুরোর মতো রদ্রিগেজও প্রয়াত সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক আদর্শ ‘চ্যাভিজমো’-র অনুসারী। একজন ‘চ্যাভিস্টা’ হিসেবে তিনি ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। তিনি মাদুরো ও তার স্ত্রীর আটককে একটি ‘বেআইনি অপহরণ’ এবং ‘নৃশংস হামলা’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন রদ্রিগেজ সরকারকে এ পর্যন্ত সহযোগিতামূলক হিসেবে বর্ণনা করলেও ভেতরে ভেতরে অনেক দাবি জানানো হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প রদ্রিগেজকে রাশিয়া, চীন, কিউবা এবং ইরানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই দাবিগুলো শেষ পর্যন্ত জনসমক্ষে কোনো বিবাদের জন্ম দেয় কি না, তা দেখার বিষয়।
এদিকে, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, রদ্রিগেজ সরকার মাদুরোর আমলের মতোই ভিন্নমত দমন অব্যাহত রেখেছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে মাদুরোর আটক হওয়াকে যারা উদযাপন করছে, তাদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘ফোরো পেনাল’ জানিয়েছে, গত ৫ জানুয়ারি মার্কিন হামলার প্রেক্ষাপটে ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ ১৪ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছিল, যদিও পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ভেনেজুয়েলার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘদিনের নিন্দা জানালেও, মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার এই মার্কিন সামরিক অভিযানেরও সমালোচনা করা হচ্ছে। গত বুধবার জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞ দল সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ একটি ‘আন্তর্জাতিক আগ্রাসনের অপরাধ’।
তারা লিখেছেন, “এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিগুলোর একটি গুরুতর ও ইচ্ছাকৃত লঙ্ঘন। এটি একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করছে এবং পুরো অঞ্চল ও বিশ্বকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।”
তথ্যসূত্র : আলজাজিরা
Comments