Image description

ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও ঘৃণাভাষণ (হেট স্পিচ) ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিমদের পাশাপাশি এখন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। বড়দিনের উৎসবকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে খ্রিস্টানদের ওপর হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের একাধিক ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বড়দিনে সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নীরবতা
গত বড়দিনের আগের সন্ধ্যায় ছত্তিশগড়ের রাজধানী রায়পুরে কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠনগুলো ধর্মঘটের ডাক দেয়। তাদের অভিযোগ ছিল—খ্রিস্টানরা ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তর’ করাচ্ছে, যদিও এর সপক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি। ওই দিনই লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল যুবক রায়পুরের একটি শপিং মলে হামলা চালিয়ে বড়দিনের সাজসজ্জা ভাঙচুর করে। পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তারা জামিনে মুক্তি পায় এবং কারাগারের বাইরে তাদের মালা দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়।

একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লির একটি গির্জায় বড়দিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও দেশজুড়ে খ্রিস্টানদের ওপর হওয়া এসব সহিংসতার বিষয়ে কোনো নিন্দা জানাননি।

গবেষণায় ভয়াবহ তথ্য
ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট’ (সিএসওএইচ)-এর প্রকল্প ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে মোট ১,৩১৮টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩টির বেশি ঘৃণাভাষণের ঘটনা ঘটছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালের তুলনায় ঘৃণাভাষণের হার ৯৭ শতাংশ এবং ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেড়েছে। মুসলিমরা প্রধান লক্ষ্যবস্তু থাকলেও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা ঘটনার হার ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে হওয়া ১১৫টি ঘটনা ২০২৫ সালে বেড়ে ১৬০ ছাড়িয়েছে।

দেশজুড়ে হয়রানি ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব
মধ্যপ্রদেশে বিজেপির এক নেতার নেতৃত্বে দৃষ্টিহীন শিশুদের একটি বড়দিনের মধ্যাহ্নভোজে হামলা চালানো হয়। দিল্লিতে ‘সান্তা টুপি’ পরা নারীদের হেনস্তা করা এবং কেরালায় আরএসএস কর্মীর মাধ্যমে স্কুলগুলোতে বড়দিনের অনুষ্ঠান না করার হুমকি দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ২.৩ শতাংশ খ্রিস্টান এবং ১৪.২ শতাংশ মুসলিম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৫১ থেকে ২০১১ সালের আদমশুমারি পর্যন্ত খ্রিস্টানদের সংখ্যা কোনোদিন ৩ শতাংশ ছাড়ায়নি। তা সত্ত্বেও উগ্রবাদীরা ‘জোরপূর্বক ধর্মান্তর’-এর মতো ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দিচ্ছে।

বিজেপি ও আরএসএস সংযোগ
প্রতিবেদন অনুসারে, ঘৃণাভাষণের ৮৮ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে বিজেপি বা তাদের মিত্র দল শাসিত রাজ্যগুলোতে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এবং উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ঘৃণাভাষণ ছড়ানোর তালিকায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে পুষ্কর সিং ধামি ৭১টি ঘৃণাভাষণের ঘটনা নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছেন।

সিএসওএইচ-এর গবেষক রকিব নায়েক বলেন, “মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ‘অভ্যন্তরীণ শত্রু’ এবং ‘বিদেশি শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে হিন্দুদের মধ্যে কৃত্রিম ভীতি তৈরি করে সংখ্যালঘু বিরোধী আইন পাসের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে।”

বিপজ্জনক ভবিষ্যৎ
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক রাম পুনিয়ানি সতর্ক করে বলেন, “এই ঘৃণাভাষণ শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়। বিজেপি নির্বাচনী স্বার্থে আদিবাসী ও দলিত অঞ্চলে কর্মরত খ্রিস্টান মিশনারিদের ওপর হামলা করে নিজেদের ভোটব্যাংক সংহত করার চেষ্টা করছে।”

ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। ছত্তিশগড়ের আর্চবিশপ তো গির্জা ও খ্রিস্টান প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড়দিনের সময় পুলিশি সুরক্ষা চাওয়ার পরামর্শ দিতে বাধ্য হয়েছেন, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত।

তথ্যসূত্র: আলজাজিরা