Image description

তুরস্ককে ইসরায়েলের জন্য একটি ক্রমবর্ধমান কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। বিশেষ করে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান-এর নেতৃত্বে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি আগের তুলনায় আরও সক্রিয় ও প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অবস্থান, ফিলিস্তিন ইস্যুতে জোরালো ভূমিকা, এবং ইসরায়েলের প্রতি কঠোর সমালোচনা—এসব কারণে দুই দেশের সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠছে।

জেরুজালেম সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর গবেষক ইয়োনি বেন মেনাহেম এই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরেছেন তার নিবন্ধে। 

তিনি দাবি করেন যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে বা এমনকি ভেঙে পড়বে—এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন সুন্নি জোট প্রতিষ্ঠার জন্য নীরবে কাজ করছে। 

তিনি বলেন, শিয়া অক্ষের পতনের পর এমন একটি ঘটনা আঞ্চলিক শূন্যতা তৈরি করবে। তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে তুরস্ক সৌদি আরব, মিশর ও পাকিস্তানের সাথে মিলে এই শূন্যস্থান পূরণ করতে চায়।

বেন মেনাকেমের মূল্যায়নটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারার নিজেকে একটি আঞ্চলিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পদক্ষেপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার অংশ হিসেবে তারা ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং এই অঞ্চলে ইসরায়েলি স্বার্থের বিরোধিতা করছে।

সম্প্রতি এরদোয়ান ফিলিস্তিন ও লেবাননের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নৃশংসতা চালানোর অভিযোগ করেছেন এবং কারাবাখ ও লিবিয়ায় দেশটির অতীতের হস্তক্ষেপের অনুরূপ সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন।

০২৫ সালের ৫ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুল-এ ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে একটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা ইসরায়েল-এর নৌবাহিনী কর্তৃক “গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা”-র জাহাজগুলোকে বাধা দেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। ফ্লোটিলাটির উদ্দেশ্য ছিল গাজা উপত্যকা-এ পৌঁছে ইসরায়েলের আরোপিত নৌ অবরোধ ভাঙা এবং সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

সমাবেশে বক্তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন এবং গাজায় চলমান পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে আনার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি এবং ফ্লোটিলার ওপর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।

আঙ্কারা ও জেরুজালেমের মধ্যে আগে থেকেই বিদ্যমান টানাপোড়েনের সম্পর্কের পাশাপাশি এই সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো, এই দুই আঞ্চলিক শক্তিকে সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেমনটা রোববার এরদোয়ানকে দেওয়া জবাবে এমকে আমিচাই এলিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন।

কূটনৈতিক ফ্রন্টের পাশাপাশি, তুরস্ক আহমেদ আল-শারার সাথে সমন্বয় করে সিরিয়ায় তার সামরিক উপস্থিতিও জোরদার করছে । 

তবে, বেন মেনাহেম উল্লেখ করেছেন যে, ইসরায়েলের সাথে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কায় আঙ্কারা এখন পর্যন্ত দক্ষিণ সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে।

বেন মেনাহেম মনে করেন, এই পদক্ষেপগুলো আরও ব্যাপক আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যা কেবল সিরিয়া বা ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, তুরস্ক জেরুজালেম ইস্যুসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার প্রভাব বিস্তার করতে চায়; এই বিষয়গুলো ইসরায়েলকে এখনই আমলে নিতে হবে।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক ইয়োনি বেন মেনাহেম তুরস্কের নেতৃত্ব নিয়ে তার মূল্যায়নে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান-কে ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যতম “সবচেয়ে বিপজ্জনক” ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এরদোয়ানের নীতিমালা এবং আঞ্চলিক ভূমিকাই এই উদ্বেগের প্রধান কারণ।

একই সঙ্গে তিনি হাকান ফিদান-কে আঙ্কারার আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। বেন মেনাহেম দাবি করেন, এই দুই নেতার মধ্যে কিছু উত্তেজনার খবর রয়েছে, যা ফিদানের কথিত উচ্চাকাঙ্ক্ষা—ভবিষ্যতে এরদোয়ানের উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাবনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হয়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা দ্বন্দ্ব বাস্তবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো অনিশ্চিত এবং নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।