Image description

১৯৮৯ সালের ৬ জুন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনিকে শেষ বিদায় জানাতে তেহরানের রাস্তায় নেমেছিল লাখো নয়, কোটি মানুষ। শোকের সেই জনসমুদ্রে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পদদলিত হয়ে নিহত অন্তত আটজন। আহত হন প্রায় ১১ হাজার মানুষ।

পরে এই শেষযাত্রা বিশ্বের সবচেয়ে বড় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনসমাগমের স্বীকৃতি পায় গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে। সে সময় প্রায় এক কোটি দুই লাখ মানুষ, অর্থাৎ ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ অংশ নিয়েছিলেন খোমেনির জানাজা ও দাফানে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর দেশটি নতুন করে আরেকটি রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেসময় খোমেনির শেষযাত্রার সেই ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণ ও আলোকচিত্র আবারও প্রকাশ করেছে সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

খোমেনির মরদেহ রাখা হয়েছিল তেহরানের মোসাল্লা মসজিদে জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সেদিন সকালে জানাজার পর তার মরদেহ কবরস্থানে নেওয়া শুরু হলে কফিন ঘিরে ধরেন লাখো শোকাহত মানুষ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তারা বুক চাপড়াতে থাকেন, স্লোগান দেন এবং মরিয়া হয়ে ওঠেন কফিন ছুঁয়ে দেখতে।

একপর্যায়ে ভিড়ের চাপে হারিয়ে যায় কফিনের নিয়ন্ত্রণ। খোমেনির সাদা কাফনে মোড়ানো মরদেহ কফিন থেকে ছিটকে পড়ে যায় জনতার মধ্যে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী আকাশে ফাঁকা গুলি ছোড়ে এবং বিপ্লবী গার্ডের সদস্যরা কফিন আঁকড়ে ধরা শোকাহতদের হাত ছাড়াতে করেন লাঠিপেটা। তবুও কমেনি জনতার চাপ।

এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে আহত হন খোমেনির একমাত্র ছেলে ৪৩ বছর বয়সী আহমদ খোমেনিও। জনতার চাপে মাটিতে পড়ে যান তিনি। পরে লোকজন তাকে কাঁধে তুলে হাত বদল করে পৌঁছে দেয় একটি অ্যাম্বুলেন্সে। তার পাগড়ি খুলে পড়ে যায়। তিনি ফ্যাকাশে ও দুর্বল দেখালেও সচেতন ছিলেন তখনও।

শোকাহত মানুষের ভিড়ে কার্যত আটকে পড়ে মরদেহবাহী গাড়িও। তেহরান টেলিভিশন জানায়, সূর্যাস্তের আগে খোমেনিকে দাফন করা সম্ভব নয়। অথচ ইসলামি বিধান অনুযায়ী সূর্যাস্তের পর দাফন করা যায় না। ফলে দাফন কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

খোমেনিকে দাফনের পরিকল্পনা ছিল তেহরান থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে বেহেশতে জাহরা কবরস্থানে। সেখানে রয়েছে ইসলামি বিপ্লব এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধে নিহতদের কবরও। পরে নতুন সময় নির্ধারণ করে দাফন করা হয় তাকে।

সেদিন তেহরানজুড়ে বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল ‘আল্লাহু আকবার’। শোকাহতরা চিৎকার করে বলছিলেন, ‘প্রিয় ইমাম, বিদায়’ এবং ‘খোমেনি, আপনি আমাদের ছেড়ে কেন চলে গেলেন?’ শিয়া ধর্মীয় রীতি অনুসারে অনেকে বুক ও মাথা চাপড়াচ্ছিলেন। কেউ কেউ মুখ আঁচড়ে রক্তাক্ত করেন, আবার কেউ পোশাকে ছাই মাখেন। প্রচণ্ড গরমে মানুষের কষ্ট কমাতে পানি ছিটিয়ে দেন দমকলকর্মীরা।

এপি জানায়, ১৯৮৯ সালের ৩ জুন ৮৬ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান খোমেনি। এর ১১ দিন আগে তার অন্ত্রে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। মৃত্যুর আগে ২৯ পৃষ্ঠার একটি রাজনৈতিক উইল রেখে যান তিনি। তবে সেখানে তার উত্তরসূরি বা ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে ছিল না স্পষ্ট নির্দেশনা।

খোমেনির মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে অন্তর্বর্তী সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী খামেনিকে। পরবর্তী সময়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ নেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে।

খোমেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় প্রায় এক কোটি দুই লাখ মানুষের উপস্থিতি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে বিশ্বের ইতিহাসে স্বীকৃতি পায় সবচেয়ে বেশি জনসমাগম হওয়া শেষযাত্রা হিসেবে। সেই শোকাবহ দিনের বিশৃঙ্খলা আজও স্মরণ করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াগুলোর একটি হিসেবে।

সূত্র: রিপাবলিক

মানবকণ্ঠ/এমআর