বর্তমান যুগে ইন্টারনেট আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এই ইন্টারনেটের প্রাণ হলো ওয়াইফাই রাউটার। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায়, রাউটার থেকে ঠিকমতো স্পিড পাওয়া যাচ্ছে না অথবা সিগন্যাল বারবার কেটে যাচ্ছে। রাউটার দুর্বল হওয়ার পেছনে কিছু নির্দিষ্ট কারিগরি ও পারিপার্শ্বিক কারণ থাকে।
রাউটারের অবস্থান
রাউটারটি বাড়ির কোন জায়গায় রেখেছেন, সেটি তার পারফরম্যান্সের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। আপনি যদি রাউটারটি ঘরের কোনো এক কোণায়, মেঝের কাছাকাছি বা কোনো আলমারির ভেতরে রাখেন, তবে সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হবে। দেয়াল, আসবাবপত্র বা বড় কোনো বাধা সিগন্যালকে দুর্বল করে দেয়।
ইলেকট্রনিক ডিভাইসের হস্তক্ষেপ
আমাদের বাড়িতে থাকা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেমন— মাইক্রোওয়েভ ওভেন, কর্ডলেস ফোন, ব্লুটুথ স্পিকার বা বেবি মনিটর রাউটারের সিগন্যালে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই ডিভাইসগুলো সাধারণত ২.৪ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করে, যা রাউটারের ফ্রিকোয়েন্সির সাথে সংঘর্ষ তৈরি করে সিগন্যাল কমিয়ে দেয়।
পুরোনো ফার্মওয়্যার
রাউটারের ভেতরে যে সফটওয়্যার থাকে তাকে ফার্মওয়্যার বলে। স্মার্টফোনের মতো রাউটারের ফার্মওয়্যারও নিয়মিত আপডেট করতে হয়। আপনি যদি দীর্ঘদিন রাউটার আপডেট না করেন, তবে এটি ধীরগতির হয়ে যেতে পারে এবং নিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
চ্যানেল ওভারল্যাপিং
আপনার আশেপাশে যদি অনেকগুলো ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক থাকে (যেমন ফ্ল্যাট বাড়িতে হয়), তবে সবার রাউটার একই চ্যানেলে কাজ করার চেষ্টা করে। একে বলে 'চ্যানেল কনজেশন'। এর ফলে সিগন্যাল জ্যাম তৈরি হয় এবং রাউটার দুর্বল হয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত ডিভাইসের সংযোগ
প্রতিটি রাউটারের একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতা থাকে যে সে কতগুলো ডিভাইসকে একসাথে সামলাতে পারবে। আপনার রাউটারে যদি ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা স্মার্ট গ্যাজেট যুক্ত থাকে, তবে ব্যান্ডউইথ ভাগ হয়ে যায় এবং রাউটারটি দুর্বল পারফরম্যান্স দেয়।
রাউটারের বয়স ও হার্ডওয়্যার সমস্যা
একটি রাউটার টানা কয়েক বছর চললে তার ভেতরের হার্ডওয়্যার গরম হয়ে কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করে। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। পুরোনো মডেলের রাউটারগুলো নতুন প্রজন্মের উচ্চগতির ইন্টারনেট হ্যান্ডেল করতে পারে না, ফলে সংযোগ দুর্বল মনে হয়।
কাভারেজ এরিয়া ও অ্যান্টেনা
আপনার বাড়ি যদি বড় হয় এবং আপনি যদি সাধারণ মানের রাউটার ব্যবহার করেন, তবে সব রুমে সিগন্যাল সমানভাবে পৌঁছাবে না। আবার রাউটারের অ্যান্টেনা যদি সঠিক দিকে মুখ করে না থাকে, তবে সিগন্যাল ডিস্ট্রিবিউশন দুর্বল হয়ে যায়।
রাউটার শক্তিশালী করার কিছু টিপস
সঠিক অবস্থান: রাউটারটিকে ঘরের মাঝখানে এবং কিছুটা উঁচু স্থানে রাখুন।
রিবুট করা: সপ্তাহে অন্তত একবার রাউটারটি রিস্টার্ট বা রিবুট দিন। এতে ক্যাশ মেমোরি পরিষ্কার হয়।
ফ্রিকোয়েন্সি বদলানো: সম্ভব হলে ৫ গিগাহার্টজ (5GHz) ব্যান্ড ব্যবহার করুন। এটি দ্রুতগতির এবং এতে ইন্টারফেয়ারেন্স কম হয়।
পাসওয়ার্ড সুরক্ষা: অপরিচিত কেউ যেন আপনার ওয়াইফাই ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
ফার্মওয়্যার আপডেট: নিয়মিত রাউটারের সেটিংস থেকে আপডেট চেক করুন।
মেশ রাউটার ব্যবহার: যদি বাড়ি বড় হয়, তবে একটি রাউটারের বদলে 'মেশ ওয়াইফাই সিস্টেম' (Mesh WiFi) ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ।
রাউটার দুর্বল হওয়ার মানেই এই নয় যে সেটি নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক সময় সামান্য কিছু পরিবর্তন এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমেই ইন্টারনেটের পূর্ণ গতি ফিরে পাওয়া সম্ভব। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারই আপনার অনলাইন অভিজ্ঞতাকে করতে পারে আরও সহজ ও আনন্দদায়ক।




Comments