পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে বিদ্যমান এক গভীর ও জটিল সম্পর্কের নতুন তথ্য খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, চাঁদের পরিবেশ গঠনে পৃথিবীর ভূমিকা আমাদের পূর্ববর্তী ধারণার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান বিষয়ক জনপ্রিয় পোর্টাল ‘সায়েন্স ডেইলি’-র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে নীরবে চাঁদের পৃষ্ঠে ক্ষুদ্র কণিকা আকারে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে আসছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, পৃথিবী থেকে নির্গত এই ক্ষুদ্র কণিকাগুলো চাঁদের পৃষ্ঠের মাটিতে ‘পুষ্টি’ হিসেবে জমা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই উপাদানগুলো চাঁদে মানুষের বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
‘ন্যাচার কমিউনিকেশনস আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণায় রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এই কণিকা স্থানান্তর প্রক্রিয়াকে বাধা দেওয়ার বদলে বরং সহায়তা করেছে।
রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং ল্যাবরেটরি ফর লেজার এনার্জি (এলএলই)-এর বিজ্ঞানী এরিক ব্ল্যাকম্যান বলেন, “চাঁদের মাটিতে সংরক্ষিত এই কণিকা এবং সৌর বায়ুর সঙ্গে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মিথস্ক্রিয়া বিশ্লেষণ করে আমরা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বক ক্ষেত্রের ইতিহাস পুনর্গঠন করতে পারি।”
দীর্ঘ বিলিয়ন বছর ধরে চলতে থাকা এই প্রক্রিয়ার ফলে চাঁদের ভূপৃষ্ঠ এখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের এক দীর্ঘস্থায়ী ‘সংরক্ষণাগারে’ পরিণত হয়েছে।
১৯৭০-এর দশকে অ্যাপোলো অভিযানের মাধ্যমে সংগৃহীত চাঁদের পাথর ও মাটি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সেখানে পানি, কার্বন ডাই-অক্সাইড, হিলিয়াম, আর্গন এবং নাইট্রোজেনের মতো উপাদানের উপস্থিতি পেয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, এর একটি অংশ সৌর বায়ু থেকে এসেছে। তবে নাইট্রোজেনের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, তা কেবল সৌর বায়ু দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব ছিল।
এর আগে অন্য কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল, এই কণিকাগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র গঠিত হওয়ার আগেই চাঁদের পৃষ্ঠে পৌঁছেছিল। কারণ, চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার পর বায়ুমণ্ডলীয় কণিকাগুলো আটকে যাওয়ার কথা। তবে বর্তমান গবেষণায় বিজ্ঞানীরা উন্নত কম্পিউটার সিমুলেশন ব্যবহার করে ভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তারা দেখিয়েছেন, পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র আসলে এই কণিকাগুলোকে চাঁদের দিকে পাঠাতে সাহায্য করে।
গবেষণার সহ-গবেষক পরামানিক বলেন, আমাদের গবেষণা মঙ্গলের মতো গ্রহগুলোর প্রাথমিক বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষয় বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বর্তমানে মঙ্গলের গ্রহব্যাপী কোনো চৌম্বক ক্ষেত্র নেই, তবে ধারণা করা হয়, অতীতে সেখানে পৃথিবীর মতো একটি চৌম্বক ক্ষেত্র এবং তুলনামূলক ঘন বায়ুমণ্ডল ছিল।
তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন সময়পর্বে গ্রহের বিবর্তন ও বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষয় একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে এই প্রক্রিয়াগুলো কীভাবে গ্রহের বাসযোগ্যতা গড়ে তোলে সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।।




Comments