ভিনগ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা হতে পারে ‘গণিত’, উত্তর দিচ্ছে মৌমাছি
মানুষ বরাবরই মহাকাশ নিয়ে কৌতূহলী। আমাদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে—মহাবিশ্বে কি আমরা একা? যদি একা না হই, তবে বুদ্ধিমান প্রাণীরা দেখতে কেমন হবে? আর তাদের সঙ্গে আমরা যোগাযোগই বা করব কীভাবে?
ভিনগ্রহের প্রাণের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা এখন বৈজ্ঞানিকভাবেই স্বীকৃত। কিন্তু এক নক্ষত্র থেকে অন্য নক্ষত্রের দূরত্ব এত বিশাল যে, সেখানে সশরীরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। যদি কখনো ভিনগ্রহের প্রাণীদের (এলিয়েন) সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়, তবে তা হবে দূরপাল্লার বার্তার মাধ্যমে। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী নক্ষত্রটিও ৪.৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। অর্থাৎ, খুব আশাবাদী হলেও সেখান থেকে কোনো বার্তার আদান-প্রদান সম্পন্ন হতে অন্তত ১০ বছর সময় লাগবে।
কিন্তু কোনো সাধারণ ভাষা ছাড়াই এই যোগাযোগ কীভাবে সম্ভব? এর উত্তর খুঁজতে আমরা পৃথিবীতেই এমন এক প্রাণীর ওপর নজর দিতে পারি যাদের চিন্তাচেতনা আমাদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন—মৌমাছি।
মানুষ এবং মৌমাছির মস্তিষ্কের গঠন ও আকারে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও উভয় প্রজাতিই গণিত বুঝতে সক্ষম। সম্প্রতি ‘লিওনার্দো’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে আমরা দাবি করেছি যে, গণিতই হতে পারে একটি ‘মহাজাগতিক ভাষা’, যা ভবিষ্যতে নক্ষত্রদের মাঝে যোগাযোগের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
বিজ্ঞানের ভাষা হিসেবে গণিত
গণিত যে সার্বজনীন, এই ধারণা নতুন নয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে গ্যালিলিও গ্যালিলি লিখেছিলেন, মহাবিশ্ব একটি বিশাল বইয়ের মতো, যা “গণিতের ভাষায় লেখা”।
কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশনেও গণিতকে মহাজাগতিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখানো হয়েছে। ১৯৮৫ সালের উপন্যাস ও ১৯৯৭ সালের সিনেমা ‘কনট্যাক্ট’-এ দেখা যায়, ভিনগ্রহের প্রাণীরা রেডিও সিগন্যালের মাধ্যমে মৌলিক সংখ্যার একটি ধারা পাঠিয়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। লিউ সিক্সিনের বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য থ্রি-বডি প্রবলেম’ এবং ২০১৬ সালের সিনেমা ‘অ্যারাইভাল’-এও ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে গণিতের ব্যবহার দেখানো হয়েছে।
বাস্তব জীবনেও বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক যোগাযোগের জন্য গণিত ও সংখ্যাকে বেছে নিয়েছেন। ১৯৭৭ সালে পাঠানো ‘ভয়েজার ১’ ও ‘ভয়েজার ২’ মহাকাশযানে গোল্ডেন রেকর্ড বা সোনার রেকর্ড পাঠানো হয়েছিল, যেখানে পৃথিবী সম্পর্কে তথ্য দিতে গাণিতিক ও শারীরিক পরিমাপ খোদাই করা ছিল। ১৯৭৪ সালের ‘আরেসিবো’ রেডিও বার্তায় ১৬৭৯টি বাইনারি সংকেত পাঠানো হয়েছিল, যার মাধ্যমে ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যা এবং ডিএনএ-র রাসায়নিক উপাদানের পরিচয় দেওয়া হয়েছিল।
এলিয়েন ছাড়াই সার্বজনীন ভাষার পরীক্ষা কীভাবে সম্ভব?
দুটি অ্যান্টেনা, ছয়টি পা এবং পাঁচটি চোখবিশিষ্ট কোনো প্রাণীকে হয়তো আপনার ‘এলিয়েন’ মনে হতে পারে, কিন্তু এটি আসলে একটি মৌমাছির বর্ণনা। মৌমাছি ও মানুষের পূর্বপুরুষরা প্রায় ৬০ কোটি বছর আগে বিবর্তনের পথ আলাদা করেছিল। তবুও আমাদের উভয়ের মাঝেই যোগাযোগ দক্ষতা, সামাজিকতা এবং কিছু গাণিতিক সক্ষমতা রয়েছে। মৌমাছিরা ‘ওয়াগল ড্যান্স’-এর মাধ্যমে খাবারের দূরত্ব, দিক এবং সূর্যের কোণ নির্ণয় করে নিজেদের মাঝে নিখুঁত যোগাযোগ রক্ষা করে।
মৌমাছির সঙ্গে মানুষের বিবর্তনীয় বিচ্ছিন্নতা এবং মস্তিষ্কের বিশাল পার্থক্যের কারণে তাদের আমরা পৃথিবীর বুকেই এক ধরনের ‘পতঙ্গরূপী এলিয়েন মডেল’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি।
মৌমাছি ও গণিত
২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পরিচালিত এক ধারাবাহিক গবেষণায় আমরা মৌমাছির গণিত শেখার ক্ষমতা পরীক্ষা করি। মুক্তভাবে উড়ন্ত মৌমাছিরা চিনি-মিশ্রিত জলের লোভে আমাদের গাণিতিক পরীক্ষায় নিয়মিত অংশ নেয়।
এই পরীক্ষায় মৌমাছিরা সাধারণ যোগ-বিয়োগ সমাধান করা, জোড় ও বিজোড় সংখ্যা আলাদা করা এবং ‘শূন্য’-এর ধারণা বুঝতে পারার প্রমাণ দিয়েছে। এমনকি তারা প্রতীকের সঙ্গে সংখ্যার সম্পর্কও স্থাপন করতে পেরেছে—ঠিক যেভাবে মানুষ আরবীয় বা রোমান সংখ্যা শেখে।
মানুষ এবং মৌমাছির মতো দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতি যদি গণিত চর্চা করতে পারে, তবে ধারণা করা যায় গণিতই হতে পারে মহাজাগতিক ভাষা। যদি মহাবিশ্বে অন্য কোনো উন্নত বুদ্ধিসম্পন্ন প্রজাতি থাকে, তবে আমাদের এই গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, তাদেরও গণিত বোঝার ক্ষমতা থাকার সম্ভাবনা প্রবল। এখন দেখার বিষয় হলো, ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতি গণিতকে কি আলাদা কোনো ‘উপভাষা’র মতো করে গড়ে তোলে কি না।
এই আবিষ্কারগুলো কেবল এলিয়েন সন্ধানেই নয়, বরং গণিত কি মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত উদ্ভাবন নাকি এটি বুদ্ধিমত্তার অনিবার্য ফল ও সার্বজনীন সত্য—সেই মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতেও সাহায্য করবে।




Comments